টানা তিন বছরে স্কুলে ভর্তির হার কমল প্রায় ৫০ লক্ষ

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

টানা তিন বছর ধরে দেশে স্কুলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ক্রমাগত কমছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, ২০২৪-’২৫ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ১১ লক্ষ পড়ুয়া কম ভর্তি হয়েছে স্কুলে। সব মিলিয়ে গত তিন বছরে ভর্তির সংখ্যা কমেছে প্রায় ৫০ লক্ষ। শুধুমাত্র সরকারি এবং সরকার পোষিত স্কুলগুলিতেই এই ভর্তির হার হঠাৎ কমে যাওয়ায় যথেষ্ট উদ্বেগ বেড়েছে।

জানা গিয়েছে, প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করে এই রিপোর্ট প্রকাশ করেছে কেন্দ্রের শিক্ষা দপ্তর। সেই রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, ২০২৩-’২৪ শিক্ষাবর্ষে দেশে স্কুলে মোট পড়ুয়া ছিল ২৪.৮০ কোটি। ২০২৪-’২৫ শিক্ষাবর্ষে সেই সংখ্যা নেমে দাঁড়িয়েছে ২৪.৬৯ কোটি। তবে মূলত ছেলে পড়ুয়া ভর্তির সংখ্যা কমেছে, তুলনায় মেয়েদের ভর্তির সংখ্যা সামান্য বেড়েছে।

২০২২-’২৩ শিক্ষাবর্ষেও একই ছবি ধরা পড়েছিল। সেই সময় ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা নেমে গিয়েছিল ২৫.১৮ কোটিতে। করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতিকে এই প্রবণতার প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হলেও প্রত্যাশা ছিল পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ভর্তি বাড়বে। কিন্তু তিন বছর পরেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। উল্টে ভর্তি আরও কমেছে।


কেন্দ্রীয় শিক্ষা দপ্তরের এক আধিকারিকের দাবি, অতিমারির পর ভর্তি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। তার ফলে নামের পুনরাবৃত্তি বাদ পড়ায় সংখ্যা কিছুটা কমেছে। আবার জন্মহারের পতনকেও কারণ হিসাবে দেখা হচ্ছে। তবে দপ্তরের মতে, আগামী জনগণনার পর সঠিক চিত্র প্রকাশ্যে আসবে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, সরকারি এবং সরকার পোষিত স্কুলে ২০২২-’২৩ শিক্ষাবর্ষে যেখানে পড়ুয়া সংখ্যা ছিল ১৩.৬২ কোটি, ২০২৪-’২৫ শিক্ষাবর্ষে তা কমে হয়েছে ১২.১৬ কোটি। অন্যদিকে, বেসরকারি স্কুলে ভর্তির সংখ্যা বেড়েছে। ২০২২-’২৩ শিক্ষাবর্ষে যেখানে ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ছিল ৮.৪২ কোটি, ২০২৪-’২৫ শিক্ষাবর্ষে তা বেড়ে হয়েছে ৯.৫৯ কোটি। বর্তমানে দেশের মোট স্কুলপড়ুয়ার ৩৯ শতাংশই পড়ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। একই সঙ্গে প্রায় ৪৮ হাজার নতুন বেসরকারি স্কুল চালু হয়েছে এই সময়ে। আর বন্ধ হয়ে গিয়েছে প্রায় ৫০ হাজার সরকারি স্কুল।

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর বক্তব্য, ‘বিশ্বায়নের পর থেকে আঞ্চলিক ভাষার স্কুলে ভর্তির হার কমছিল। তবে সরকারি স্কুলে এখনও চাহিদা রয়েছে। কিন্তু যদি দেখা যায় কেন্দ্রীয় স্কুলেও ভর্তি কমছে, তা হলে বুঝতে হবে কেন্দ্রীয় সরকার শিক্ষাব্যবস্থাকে বেসরকারি হাতে তুলে দিতে চাইছে।’

শিক্ষাবিদদের মতে, সরকারি স্কুলে মিড-ডে মিল বা সাইকেলের মতো সুবিধা আকর্ষক হলেও পড়াশোনার মান উন্নত না হওয়ায় অভিভাবকরা সন্তানদের বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করাচ্ছেন। আবার এক অভিজ্ঞ শিক্ষক প্রশ্ন তুলেছেন, ‘যখন সরকারি স্কুলের শিক্ষকরাও তাঁদের সন্তানকে সরকারি স্কুলে ভর্তি করাচ্ছেন না, তখন সাধারণ মানুষ কী ভরসায় করবেন?’

‘শিক্ষানুরাগী ঐক্য মঞ্চ’-এর সাধারণ সম্পাদক কিঙ্কর অধিকারীর বক্তব্য, ‘কেন্দ্রের শিক্ষানীতির জন্য শিক্ষার ব্যাপক বেসরকারিকরণ হয়েছে। সরকারি স্কুলে উপযুক্ত পরিকাঠামো, শিক্ষক, আধুনিক সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। ফলে সাধারণ ও গরিব পরিবারগুলি প্রকৃত শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’

শিক্ষা দপ্তরের এই রিপোর্ট এখন বিশেষজ্ঞ ও অভিভাবক— দুই মহলেই দেশের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে।