ভারতে বাণিজ্যিক উপগ্রহ ইন্টারনেট (satellite broadband) পরিষেবা চালুর ছাড়পত্র পাওয়ার শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে আচমকা বড়সড় বাধার মুখে পড়লেন ইলন মাস্ক (Elon Musk)। মার্কিন ধনকুবেরের মহাকাশ সংস্থা স্পেসএক্সের আওতাধীন ‘স্টারলিঙ্ক’কে (Starlink) ভারতে পরিষেবা চালুর অনুমতি না দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে সরাসরি দাবি জানাল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (RSS) অর্থনৈতিক শাখা ‘স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ’ (Swadeshi Jagran Manch-SJM)। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, বিদেশি উপগ্রহের মাধ্যমে সরাসরি দেওয়া ইন্টারনেট পরিষেবা ভারতের অভ্যন্তরীণ জাতীয় নিরাপত্তা (national security) ও নজরদারি ব্যবস্থার পক্ষে এক মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে।
নজরদারির সংকট
সম্প্রতি দিল্লির রাজপথে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে চলা তীব্র বিক্ষোভ এবং তার প্রেক্ষিতে মধ্য দিল্লিতে ২৪ ঘণ্টার মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্তকে সামনে এনেই নিজেদের যুক্তি সাজিয়েছে স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ। সংগঠনের জাতীয় সহ-আহ্বায়ক অশ্বিনী মহাজন এক কড়া বিবৃতিতে জানিয়েছেন, দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যখন সংবেদনশীল পরিস্থিতির মধ্যে থাকে, তখন ইন্টারনেট ও সমাজমাধ্যমকে ব্যবহার করে ভুয়ো খবর বা দেশবিরোধী প্রচার ছড়ানোর প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে যায়।
সাধারণ টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আপৎকালীন পরিস্থিতিতে ইন্টারনেটে রাশ টানা বা নির্দিষ্ট ডেটা খতিয়ে দেখা সম্ভব হয়, কারণ সমস্ত তথ্য দেশের অভ্যন্তরে থাকা গেটওয়ের (domestic gateways) মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। কিন্তু স্টারলিঙ্কের মতো পৃথিবীর একেবারে কাছাকাছি থাকা উপগ্রহ নেটওয়ার্ক (low Earth orbit satellites) স্থানীয় পরিকাঠামো এড়িয়ে সরাসরি উপভোক্তার যন্ত্রে সঙ্কেত পাঠায়। মঞ্চের দাবি, এই প্রযুক্তি চালু হলে প্রশাসন চাইলেও হিংসা বা অশান্তির সময় নেট বন্ধ করতে পারবে না। ইউক্রেন, রাশিয়া কিংবা ইরানের যুদ্ধ ও গণবিক্ষোভের উদাহরণ টেনে সঙ্ঘের সংগঠনটির সতর্কবার্তা, প্রচলিত নজরদারির বাইরে গিয়ে সীমান্ত এলাকায় জঙ্গি গোষ্ঠী বা চোরাচালানকারীরাও এই অনিয়ন্ত্রিত উপগ্রহ ইন্টারনেটের সুবিধা নিতে পারে।
ধনকুবেরের তোপ
ভারতে স্টারলিঙ্কের প্রবেশ পিছিয়ে যাওয়া নিয়ে গত কয়েক দিনে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন স্বয়ং ইলন মাস্ক। তিনি সমাজমাধ্যমে ভারতীয় কর্পোরেট বা তথাকথিত ‘অলিগার্কদের’ দিকে আঙুল তুলে তোপ দেগেছিলেন যে, স্বদেশি ধনকুবেরদের চাপেই তাঁর সংস্থাকে আটকে রাখা হচ্ছে। এমনকি নাম না করে বিঁধেছিলেন মুকেশ অম্বানীকেও।
মাস্কের সেই আক্রমণকে সরাসরি খারিজ করেছে স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ। তাদের পাল্টা দাবি, ভারতের টেলিকম নিয়মের কড়া শর্ত মানতে না পেরে এখন হতাশা থেকে জনমত তৈরির চেষ্টা করছেন মাস্ক। ভারতীয় উপভোক্তাদের ডেটা ভারতের মাটিতেই সংরক্ষণ এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বৈধ নজরদারির আওতায় থাকার স্পষ্ট নির্দেশিকা রয়েছে। সরকারি সূত্রের খবর, সেই শর্ত পূরণ নিয়ে স্টারলিঙ্ক এখনও অস্পষ্টতা রেখে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় টেলিকম মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, সুরক্ষার ছাড়পত্র দেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভাবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের (MHA) এক্তিয়ারভুক্ত।
আমেরিকাকে কূটনৈতিক বার্তা
বিদেশি সংস্থার উপর নির্ভর না করে দেশের নিজস্ব কৃত্রিম উপগ্রহ ইন্টারনেট ব্যবস্থা (indigenous satcom capabilities) দ্রুত গড়ে তোলার পক্ষে সওয়াল করেছে সঙ্ঘের এই শাখা। ইসরো (ISRO) এবং ঘরোয়া প্রযুক্তি সংস্থাগুলির যৌথ উদ্যোগে প্রত্যন্ত পাহাড়ি ও সীমান্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি তুলেছে তারা।
একই সঙ্গে বিষয়টির সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কূটনীতিকেও জুড়ে দিয়েছে মঞ্চ। তাদের বক্তব্য, জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে আমেরিকা যদি ভারতীয় পণ্য আমদানির উপর অতিরিক্ত শুল্ক চাপাতে পারে, তবে ভারতেরও নিজের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব (digital sovereignty) ও সীমান্ত সুরক্ষার স্বার্থে মার্কিন সংস্থাকে আটকানোর পূর্ণ অধিকার আছে। দিল্লির প্রশাসনিক করিডোরে সঙ্ঘের এই প্রতিবাদ মাস্কের ভারত সফরের স্বপ্নকে কতটা পিছিয়ে দেয়, এখন সে দিকেই তাকিয়ে বাণিজ্য মহল।