সাইবার প্রতারণায় গ্রাহক সুরক্ষায় জোর আরবিআই-এর  

ডিজিটাল লেনদেনের যুগে সাইবার প্রতারণা বর্তমানে সাধারণ মানুষের কাছে বড় উদ্বেগ। ভুয়ো কেওয়াইসি আপডেট, ফিশিং লিঙ্ক, নকল অ্যাপ কিংবা ওটিপি জালিয়াতির ফাঁদে পড়ে মুহূর্তের মধ্যে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খালি হয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রায়শই সামনে আসে। এতদিন টাকা হারানোর পর তা ফেরত পাওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন বিষয়। এবার গ্রাহকদের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে বড় পদক্ষেপ নিল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া।

তাদের নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, যেসব গ্রাহকরা ডিজিটাল ব্যাঙ্কিং জালিয়াতির শিকার তারা যদি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করেন, তাহলে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এই নিয়ম কার্যকর হবে। সেই তারিখের পর গ্রাহকের অনুমতি ছাড়া বা তাঁর অজান্তে অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে গেলে এই নিয়মের আওতায় ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাবে।

আরবিআইয়ের সংশোধিত কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হল প্রতারণার ঘটনায় গ্রাহকের দায় প্রমাণ করার দায়িত্ব এখন থেকে ব্যাঙ্কের উপরই বর্তাবে। গ্রাহকের ভুল বা গাফিলতির কারণে প্রতারণা হয়েছে কি না তা এখন ব্যাঙ্ককেই প্রমাণ করতে হবে। নতুন নিয়মে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য কয়েকটি শর্তও রাখা হয়েছে। কোনও গ্রাহক যদি সাইবার প্রতারণার শিকার হন, তবে ঘটনার পাঁচদিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কের কাছে অভিযোগ জানাতে হবে। এর পাশাপাশি জাতীয় সাইবার ক্রাইম পোর্টাল বা ১৯৩০ নম্বরে অভিযোগ নথিভুক্ত করতে হবে। তদন্তে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে এবং ক্ষতির পরিমাণ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে হলে মোট ক্ষতির ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত ফেরত পাওয়া যাবে। তবে ক্ষতিপূরণের সর্বোচ্চ সীমা ২৫ হাজার টাকা। তবে গ্রাহক এই সুবিধা বারবার পাবেন না। তিনি এই সুবিধা একবারই পাবেন।


আরবিআই স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ব্যাঙ্কের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি, লেনদেনের সতর্কবার্তা পাঠানোর ক্ষেত্রে ব্যর্থতা, অভিযোগ গ্রহণে গাফিলতি, সিস্টেমের সমস্যা বা অভ্যন্তরীণ জালিয়াতির কারণে যদি টাকা খোওয়া যায়, তাহলে গ্রাহকের কোনও দায় থাকবে না। এছাড়া পেমেন্ট গেটওয়ে, টেলিকম পরিষেবা সংস্থা বা অন্য কোনও তৃতীয় পক্ষের ত্রুটির কারণেও গ্রাহককে ক্ষতির বোঝা বহন করতে হবে না। তবে এ সমস্তটাই কার্যকর হবে যদি গ্রাহক সময়মতো অভিযোগ জানায়।

শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, প্রতারণা ঠেকাতে ব্যাঙ্কগুলির উপরও নতুন দায়িত্ব চাপিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। এখন থেকে ২৪ ঘণ্টা জালিয়াতির অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে। ফোন, এসএমএস, ই-মেল, টোল-ফ্রি নম্বর, ওয়েবসাইট এবং মোবাইল অ্যাপ সবেতেই অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকতে হবে। প্রতিটি অভিযোগের জন্য একটি রেফারেন্স নম্বরও দিতে হবে। এছাড়া ৫০০ টাকার বেশি সব ইলেকট্রনিক লেনদেনের ক্ষেত্রে এসএমএস সতর্কবার্তা পাঠানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। গ্রাহকের ই-মেল নথিভুক্ত থাকলে তার মাধ্যমেও সতর্কবার্তা পাঠাতে হবে। এই পরিষেবার জন্য ব্যাঙ্ক কোনও অতিরিক্ত টাকা নিতে পারবে না।

আরবিআইয়ের আরেকটি বড় লক্ষ্য হল এআইয়ের সাহায্যে প্রতারণা চিহ্নিত করা। সেই কারণে ব্যাঙ্কগুলিকে উন্নত এআই, মেশিন লার্নিং এবং স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল প্রতারণা মোকাবিলার ক্ষেত্রে এটি আরবিআইয়ের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার। তবে এই সুরক্ষার সুবিধা পেতে গেলে গ্রাহকদেরও সচেতন থাকতে হবে।