২০২৬ সালের নিট-ইউজি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস নিয়ে দিল্লিতে ছাত্র-যুবদের বিক্ষোভের এক দিন পর প্রথমবার এ বিষয়ে মুখ খুললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এনডিএ সংসদীয় দলের ‘মঙ্গল মিলন’ বৈঠকের পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানান, প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নফাঁসকে মহাপাপ বলে উল্লেখ করেছেন এবং এই ধরনের অপরাধ রোধ করা গোটা দেশের মিলিত দায়িত্ব বলে জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সংসদ ভবনের লাইব্রেরি ভবনের জিএমসি বালাযোগী অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এনডিএ সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সাংসদদের উদ্দেশে বলেন, ‘ভুল পথে চলে যাওয়া খুব সহজ কিন্তু সঠিক পথে ফিরে আসা অনেক বেশি কঠিন। তাই শিশু ও তরুণদের সঠিক পথ দেখানো আমাদের দায়িত্ব।‘ তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে যাতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনও সুযোগ না থাকে, সে জন্য সব পক্ষকে একযোগে একটি ত্রুটিমুক্ত ও নির্ভুল পরীক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
এনডিএ-র শরিক দলগুলিকে আইন প্রণয়নের কাজে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। সেই সঙ্গে বিরোধীদলগুলিকে সংসদে গঠনমূলক ভূমিকা পালনের আবেদন রাখেন। বিরোধীদের উদ্দেশে বলেন, মতপার্থক্য থাকতেই পারে, তবে দেশের ভবিষ্যৎ ও যুবসমাজের স্বার্থে সব সাংসদের একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন।
সোমবার নিট-ইউজির প্রশ্নফাঁস-সহ একাধিক ইস্যুতে সংসদ অভিযান ঘিরে উত্তপ্ত ওঠে রাজধানী দিল্লি। আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি ছিল, প্রশ্নফাঁসের দায় স্বীকার করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। এই আন্দোলনের প্রতিবাদমঞ্চে যোগ দেন পরিবেশবিদ ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক।
সংসদ অভিযান ঠেকাতে সোমবার দিল্লিজুড়ে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিভিন্ন এলাকায় ব্যারিকেড বসানো হয় এবং ১৬৩ ধারা জারি করে চার জনের বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়। পুলিশ লাঠি ও কাঁদানে গ্যাস নিয়ে হাজির ছিল। তারপরও বহু বিক্ষোভকারী সংসদ ভবনের কাছে পৌঁছে যান। শেষ পর্যন্ত তাঁদের সংসদ ভবনের আগে আটকে দেয় পুলিশ। আন্দোলনকারী অভিযোগ, ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয় এবং বহু মানুষকে আটক করা হয়। পরে অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে ‘ককরোচ’ দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের দপ্তরে গিয়ে প্রায় চার ঘণ্টা বৈঠক করেন বলে খবর। এরপর কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নড্ডার সঙ্গে বৈঠক হলেও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেননি ককরোচ জনতা পার্টি। সোনম ওয়াংচুকও স্পষ্ট জানিয়ে দেন, হাসপাতালে থেকেও তিনি অনশন চালিয়ে যাবেন। বৈঠকের পর নড্ডা জানান, বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকেই প্রথমবার সরকারের আলোচনার প্রস্তাব আসে। সকাল ১১টা ৫০ মিনিট থেকে আলোচনা শুরু হয়ে বিকেল ৪টার দিকে আন্দোলনকারীদের একটি লিখিত আবেদন তাঁর হাতে পৌঁছয়। একই সঙ্গে তিনি আন্দোলনকারীদের অবস্থান প্রত্যাহার করে প্রশাসনকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, ওয়াংচুক ঘোষণা করেন, সংসদ ভবনে সাংসদদের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি না পাওয়া সমালোচনা করে বলেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নেওয়া যুবকদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি জানান, আন্দোলনকারীদের সংসদে গিয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ না দেওয়া পর্যন্ত তিনি অনশন ভাঙবেন না। পাশাপাশি হাসপাতালে তাঁর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দেখা করার অনুমতিও তিনি চান। ওয়াংচুক কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে শিক্ষামন্ত্রীর জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান। তিনি বলেন, নানা উস্কানি সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রেখেছেন, যা তাঁকে মুগ্ধ করেছে। সরকার ও পুলিশের কাছে তাঁর আবেদন, পড়ুয়াদের যেন সংসদে গিয়ে তাঁদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, সোমবার থেকেই সংসদের বাদল অধিবেশন শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার সদস্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাংসদেরা সংসদ ভবনে উপস্থিত ছিলেন। এই পরিস্থিতিতে বিক্ষোভ মোকাবিলায় আগে থেকেই সতর্ক ছিল দিল্লি পুলিশ। শ্রমশক্তি ভবনের কাছে মিছিল আটকাতে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। এরপরও বহু বিক্ষোভকারী জাতয়ী পতাকা ও ভারতের সংবিধান হাতে, বৃষ্টির মধ্যেই সংসদ ভবনের দিকে অগ্রসর হন। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের দাবি, প্রায় ২০ হাজার মানুষ, যাঁদের অধিকাংশই ছাত্র-যুব এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন। বহু বিক্ষোভকারীকে আটক করে বাসে তুলে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যায় পুলিশ। সিজেপি নেতৃত্বের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ আন্দোল দমন করতে পুলিশ অযথা কঠোরতা দেখিয়েছে। এই বিক্ষোভের পরই মঙ্গলবার প্রথমবার নিট-ইউজির প্রশ্নফাঁস প্রসঙ্গে প্রকাশ্যে মন্তব্য করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।