ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক ময়দান আরও উত্তপ্ত করে তুললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। শনিবারের ধারাবাহিক প্রচারের পর রবিবার শিলিগুড়ির জনসভা থেকে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে একের পর এক তোপ দাগলেন তিনি। রাজ্যের উন্নয়নে বঞ্চনা থেকে শুরু করে বন্যা পরিস্থিতি, বাজেট বরাদ্দ থেকে ‘তুষ্টিকরণ’ রাজনীতি— প্রায় সব ইস্যুতেই রাজ্য সরকারকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
রবিবারের সভা থেকে মোদীর অভিযোগ, গত ১৫ বছরে তৃণমূল সরকার উত্তরবঙ্গকে ইচ্ছাকৃতভাবে পিছিয়ে রেখেছে। তাঁর কথায়, ‘উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে কোনও সদিচ্ছাই নেই ওদের। কেন্দ্র যে টাকা পাঠিয়েছে, তা ব্যবহারও করা হয়নি ঠিকভাবে।’ একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, উত্তরবঙ্গ বিরোধী মানসিকতা নিয়েই রাজ্য সরকার কাজ করেছে। আদিবাসী, চা-বাগান শ্রমিক, মহিলা ও যুব সম্প্রদায়— সকলেই বঞ্চিত হয়েছেন।
বন্যা পরিস্থিতি নিয়েও তীব্র সমালোচনা শোনা যায় প্রধানমন্ত্রীর গলায়। তিনি বলেন, ‘যখন উত্তরবঙ্গ বন্যায় ভাসছিল, মানুষ চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছিল, তখন কলকাতায় উৎসব পালন করছিল তৃণমূল সরকার।’ বাজেট বরাদ্দ নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি অভিযোগ করেন, নির্দিষ্ট ভোটব্যাঙ্ককে তুষ্ট করতেই সরকার বেশি আগ্রহী। অথচ উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করা হয়নি।
এদিনের সভা থেকে একাধিক প্রতিশ্রুতিও দেন মোদী। তিনি বলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে উত্তরবঙ্গে ক্যান্সার হাসপাতাল, ফ্যাশন ইনস্টিটিউট এবং উচ্চশিক্ষার বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি চা-বাগান এলাকার উন্নয়ন এবং আদিবাসী গ্রামগুলিতে পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
নারী সুরক্ষা, কর্মসংস্থান এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলার মানুষ বামেদের সুযোগ দিয়েছেন। তৃণমূলকেও সুযোগ দিয়েছেন। এবার মোদীকে একটা সুযোগ দিন।’ মেয়েদের আর্থিক সহায়তা হিসেবে তিন হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুপ্রবেশের ইস্যুতেও সরব হয়ে মোদী দাবি করেন, এর ফলে উত্তরবঙ্গে সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের উপর প্রভাব পড়ছে। তাঁর আহ্বান, ‘এখনই এটা থামাতে হবে।’ পাশাপাশি ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’-এর প্রসঙ্গ তুলেও রাজ্যের শাসকদলকে আক্রমণ করেন মোদী। তিনি বলেন, দেশের নিরাপত্তা নিয়ে যারা হুমকি দেয়, তাদের তৃণমূল সমর্থন করে— যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শিলিগুড়ি করিডরকে দেশের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে তার উন্নয়নে কেন্দ্রের প্রতিশ্রুতির কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
শিলিগুড়ির এই সভায় জনসমাগম নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে মোদী বলেন, এই ভিড়ই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি দাবি করেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের বিদায় নিশ্চিত।’ পাশাপাশি উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তাঁর বার্তা, ‘আর নয় ভয়, এবার ভরসা চাই।’
শিলিগুড়ির সভায় মোদীর বক্তব্য স্পষ্ট করে দিল, উত্তরবঙ্গকে কেন্দ্র করেই এবারের নির্বাচনী লড়াইয়ে বড় কৌশল নিতে চাইছে বিজেপি। এখন দেখার, এই আক্রমণাত্মক প্রচার বাংলার ভোট রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।