ফাইল কত দ্রুত এগোচ্ছে? সংস্কারের সুবিধে বাস্তবের মাটিতে কতটা পৌঁছল? আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (AI) হাতিয়ার করে প্রশাসনকে কতটা গতিশীল করা গেল? মঙ্গলবারের ম্যারাথন বৈঠকে দেশের শীর্ষ আমলাদের এই তিনটি ধারালো প্রশ্নের মুখে দাঁড় করালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। লক্ষ্য একটাই, ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা। আর সেই পথকে মসৃণ করতেই কেন্দ্রীয় সচিবদের নিয়ে এই জরুরি পর্যালোচনা বৈঠক।
প্রধানমন্ত্রীর দফতর (PMO) সূত্রে খবর, কেন্দ্রের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের সচিবদের নিয়ে আয়োজিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রশাসনিক সংস্কার, সুশাসন, ব্যবসা করার সহজ পরিবেশ (Ease of Doing Business) এবং ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর রোডম্যাপে গতি আনার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।
ফাইল আর আটকে থাকবে না: শুধুই পর্যালোচনা নয়, অ্যাকশনের বার্তা
কেন্দ্রীয় প্রশাসনের একাংশের মতে, এই বৈঠককে আর পাঁচটা রুটিন প্রশাসনিক পর্যালোচনার খাঁচায় ফেলা ভুল হবে। আসলে আগামী কয়েক মাসে বিভিন্ন মন্ত্রকের কর্মক্ষমতা (Performance) বৃদ্ধি, সংস্কারের গতি এবং নীতিগত সিদ্ধান্তের দ্রুত বাস্তবায়নের (Policy Execution) জন্য এটি ছিল এক স্পষ্ট ও কড়া বার্তা।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ক্যাবিনেট সচিব টিভি সোমনাথন এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রধান সচিব পিকে মিশ্র, প্রধান সচিব শক্তিকান্ত দাসের মতো শীর্ষ আমলারা। প্রতিটি মন্ত্রক তাদের কাজের অগ্রগতি, সমস্যা এবং আগামী দিনের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরে।
‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ থেকে ‘ইজ অব লিভিং’
এই ম্যারাথন বৈঠকের অন্যতম মূল ফোকাস ছিল আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা লালফিতার ফাঁস (Red Tape) কেটে বেরোনো। কেন্দ্রের লক্ষ্য পরিষ্কার।ব্যবসার ক্ষেত্রে লাইসেন্স বা অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও সহজ করা। অপ্রয়োজনীয় ও সেকেলে নিয়মের বেড়াজাল ভেঙে ফেলা। সাধারণ মানুষের কাছে নাগরিক পরিষেবা (Citizen Services) দ্রুত পৌঁছে দেওয়া।
সহজ কথায়, শুধু ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করাই নয়, আমজনতার জীবনযাত্রাকে সহজ করতে অর্থাৎ ‘ইজ অব লিভিং’-এর ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রশাসনের নতুন হাতিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)
ডিজিটাল ইন্ডিয়াকে পরবর্তী স্তরে নিয়ে যেতে এবার চালকের আসনে বসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence)। বিভিন্ন মন্ত্রক কীভাবে এআই-নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ডেটা অ্যানালিসিস এবং ফাইল ক্লিয়ারেন্সের সময় কমাতে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, তা খুঁটিয়ে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। প্রশাসনিক দক্ষতা (Administrative Efficiency) বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তিকে আরও ক্ষুরধার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৫২ সপ্তাহে ৫২ সংস্কার: কতদূর এগোল কাজ?
কেন্দ্রের উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি ‘52 Reforms in 52 Weeks’-এর প্রোগ্রেস রিপোর্টও খতিয়ে দেখা হয় এই বৈঠকে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রশাসনিক সংস্কার শেষ করতে কোন মন্ত্রক কতটা দৌড়ল, কোথায় লালফিতার জট আটকে রয়েছে এবং কীভাবে তা দ্রুত কাটানো যায় তা নিয়ে বিশদে আলোচনা হয়।
বিকশিত ভারত ২০৪৭: লক্ষ্য যখন উন্নত দেশ
স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তিতে ভারতকে উন্নত দেশের তালিকায় তুলে আনার যে মহাপরিকল্পনা মোদী সরকার নিয়েছে, তার বিভিন্ন সূচক এই বৈঠকে খতিয়ে দেখা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘বিকশিত ভারত’ মানে শুধু ঝাঁ-চকচকে পরিকাঠামো নয়; এর আসল স্তম্ভ হলো দক্ষ প্রশাসন, প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার, কর্মসংস্থান, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি (Inclusive Human Development), যা সাম্প্রতিক নীতি আয়োগের বৈঠকেও উঠে এসেছিল।
কেন তাৎপর্যপূর্ণ এই বৈঠক?
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক গতি সচল রাখা, বিদেশি বিনিয়োগ টানা এবং সরকারি প্রকল্পের সুবিধা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে আমলাতন্ত্রের কর্মক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই। আর সেই কারণেই আমলাদের নির্দিষ্ট ডেডলাইন বেঁধে দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। ফাইল আটকে রাখার দিন যে শেষ, মঙ্গলবারের ম্যারাথন বৈঠকে সেই বার্তাই আরও একবার স্পষ্ট করে দিলেন নরেন্দ্র মোদী।