জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে যাঁরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছেন নিজেদের জমি, জল, জীবিকা কিংবা বসতভিটা, আইনের পুরনো সংজ্ঞার ফাঁকে তাঁদের যেন হারিয়ে যেতে না হয়। এমনই মানবিক বার্তা দিলেন ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত।
তাঁর কথায়, জলবায়ু সঙ্কটে বাস্তুচ্যুত মানুষদের জন্য প্রয়োজন স্বতন্ত্র আইনি মর্যাদা। কারণ, বর্তমান শরণার্থী ও অভিবাসন সংক্রান্ত আইন এই নতুন ধরনের বাস্তুচ্যুতির কথা মাথায় রেখে তৈরি হয়নি। লন্ডনের মার্লবরো হাউসে আয়োজিত ‘হাই-লেভেল কমনওয়েলথ পলিসি ডায়লগ অন ক্লাইমেট জাস্টিস’-এ বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘জলবায়ু সঙ্কট আগামী দিনে আইনের বহু প্রচলিত ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করবে। সবচেয়ে বিপন্ন মানুষগুলির ক্ষেত্রেই যেন আইন অনিশ্চিত হয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিচারব্যবস্থার।’
প্রধান বিচারপতির কথায়, জলবায়ুর ক্ষতি সকলের উপর সমান ভাবে আছড়ে পড়ে না। ছোট চাষি কিংবা মৎস্যজীবী পরিবার যখন এমন সঙ্কটে জমি, জল বা ফসল হারায়, যার জন্য তাদের দায় প্রায় নেই, তখন শুধু পরিবেশের ক্ষতি হয় না, ভেঙে পড়ে তাঁদের জীবিকা, মর্যাদা এবং সমতার ভিত্তি।
সেই সঙ্গে পরিচ্ছন্ন শক্তিতে বিশ্বের রূপান্তর নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, যে দেশগুলি এখন শিল্পায়নের পথে, তাদের দ্রুত কয়লা-তেল ছেড়ে নবীকরণযোগ্য শক্তির দিকে যেতে বলা হচ্ছে। অথচ উন্নত দেশগুলির অনেকেই প্রায় দুই শতাব্দী ধরে কয়লা ও তেলের উপর নির্ভর করে অর্থনৈতিক শক্তি তৈরি করেছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের দায় ও সবুজ শক্তিতে রূপান্তরের বোঝা বণ্টনেও চাই ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা।
বিচারব্যবস্থার ভূমিকা প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে বিচারকদের ক্রমশ আরও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। শুধু আইনের অক্ষর জানলেই চলবে না। যে বাস্তব পৃথিবীতে সেই আইন প্রয়োগ হচ্ছে, তাকেও বুঝতে হবে।’
পরিবেশ মামলায় বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের ভূমিকার উপরও জোর দেন তিনি। তাঁর মতে, পরিবেশ সংক্রান্ত বিচারপ্রক্রিয়া শুধুমাত্র বিচারক ও আইনজীবীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বিজ্ঞানী, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং নীতিনির্ধারকদেরও বিচারপ্রক্রিয়ার অংশ করতে হবে।
দিল্লিতে হাসপাতালের রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য অনুমতি ছাড়াই সংরক্ষিত গাছ কাটার একটি মামলার প্রসঙ্গ তুলে প্রধান বিচারপতি জানান, আদালত প্রকল্প থামিয়ে না দিয়ে ব্যাপক ক্ষতিপূরণমূলক বৃক্ষরোপণের নির্দেশ দিয়েছিল এবং তার বাস্তবায়ন নিয়মিত নজরদারিতে রেখেছিল। তাঁর তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য, ‘একটি চারা পুঁতে তাকে ভুলে গেলে তা কোনও প্রতিকার নয়।’
জলবায়ু ও পরিবেশ নিয়ে আইনি শিক্ষার পরিবর্তনেরও ডাক দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। তাঁর মতে, পরিবেশ আইন আর অল্প কয়েকজন ছাত্রের বিশেষায়িত বিষয় হয়ে থাকতে পারে না। আইন পড়ুয়াদের বিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে কাজ করা, বাস্তব পরিবেশগত বিরোধ বোঝা এবং ক্লিনিক্যাল শিক্ষার মাধ্যমে জলবায়ু সঙ্কটকে চিনতে হবে।
জলবায়ুর অভিঘাতে যাঁরা আজ ঘর, জমি কিংবা জীবিকা হারাচ্ছেন, আগামী দিনের আইন যেন তাঁদের ‘কোনও পরিচয় নেই’ বলে দূরে ঠেলে না দেয়। প্রধান বিচারপতির বক্তব্যে উঠে এল সেই গভীর মানবিক আবেদনই।