কলকাতা ভ্রমণে গিয়ে একটি বিদেশি প্রদর্শনী দেখেছিলেন তিনি। প্রায় তিন হাজার সংরক্ষিত উদ্ভিদ-চিত্রের সেই সংগ্রহ দেখে মনে প্রশ্ন জেগেছিল, বিদেশি প্রতিষ্ঠান যদি ভারতীয় উদ্ভিদজগৎকে এত যত্নে ধরে রাখতে পারে, তাহলে ভারত কেন নিজের ভেষজ ঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় দৃশ্য-সংগ্রহ তৈরি করবে না? পতঞ্জলি যোগপীঠ (Patanjali Yogpeeth)-এর মহাসচিব আচার্য বালকৃষ্ণের মনে সেদিন থেকেই বীজ বোনা হয়েছিল এই প্রকল্পের। হরিদ্বার ফিরে উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও শিল্পীদের নিয়ে আলাদা দল গড়েছিলেন তিনি। বছরের পর বছর গবেষণা আর নিরলস শিল্পসাধনার পরে সেই স্বপ্নই আজ হরিদ্বারে বাস্তব চেহারা নিয়েছে। গড়ে উঠেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হার্বাল আর্ট মিউজিয়াম (Herbal Art Museum)।
পতঞ্জলি রিসার্চ ফাউন্ডেশন (Patanjali Research Foundation)-এর ছাদের তলায় গড়ে ওঠা এই সংগ্রহশালা আসলে ঔষধি উদ্ভিদের এক দৃশ্য-বিশ্বকোষ। বিশ্বজুড়ে জৈববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ ঔষধি গাছগাছড়ার ৬৫ হাজারেরও বেশি চিত্র সংরক্ষিত রয়েছে এখানে। এর মধ্যে হাতে আঁকা রঙিন ক্যানভাস চিত্রের সংখ্যা ৩০ হাজার ৫০০। আর রেখাচিত্রের সংখ্যা ৩৫ হাজার। প্রতিটি চিত্র শুধু শিল্পকর্ম নয়, এক একটি বিজ্ঞানসম্মত নথিও বটে। গাছের গঠন, ফুল, ফল, বীজ ও পাতার সূক্ষ্ম বিন্যাস এমন নিখুঁতভাবে আঁকা হয়েছে যে গবেষক ও পড়ুয়ারা সেগুলি সরাসরি অধ্যয়ন-সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।
এক মিটার আকারের এই ক্যানভাসগুলি অ্যাক্রিলিক মাধ্যমে তৈরি। দেখতে অনেকটা জীবন্ত উদ্ভিদের মতোই বাস্তব। কর্তৃপক্ষের বিশ্বাস, এই হাতে আঁকা চিত্র নিজের আসল রূপ নিয়ে টিকে থাকবে আগামী তিনশো বছর। গোটা সংগ্রহটি ইংরেজি বর্ণানুক্রমে (Alphabetical Order) সাজানো হয়েছে। রঙিন ক্যানভাস চিত্রগুলি রাখা হয়েছে ১৭৬২টি বিশেষ স্লাইডারে। অন্যদিকে রেখাচিত্রগুলি ৫০টি কাঠের আলমারিতে, প্রতিটিতে আলাদা তাক। কর্তৃপক্ষের দাবি, আগামী বহু প্রজন্ম ধরে উদ্ভিদবিজ্ঞান, আয়ুর্বেদ ও জৈববৈচিত্র্য চর্চার ক্ষেত্রে এই সংগ্রহ অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।
এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী মহলেরও নজর কেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞান সাময়িকী ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি সায়েন্স লেটার্স (National Academy Science Letters)-এ এই সংগ্রহশালা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে প্রতিবেদন। আচার্য বালকৃষ্ণের কথায়, বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সমৃদ্ধ উদ্ভিদ-শিল্প সংগ্রহ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এটি। যা উদ্ভিদপ্রেমী আর শিল্পপ্রেমী দুই পক্ষকেই সমানভাবে আকর্ষণ করবে বলে তাঁর বিশ্বাস।
ব্রিটেনের রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনস, কিউ (Royal Botanic Gardens, Kew) এবং আমেরিকার হান্ট ইনস্টিটিউট ফর বোটানিক্যাল ডকুমেন্টেশন (Hunt Institute for Botanical Documentation)-এও উদ্ভিদ-শিল্পের সমৃদ্ধ সংগ্রহ রয়েছে তেলরং, জলরং ও স্কেচের আকারে। তবে এত বড় মাপে এমন বিজ্ঞানসম্মতভাবে শ্রেণিবদ্ধ ক্যানভাস চিত্রের সংগ্রহ সেখানেও তুলনামূলক বিরল বলে জানানো হয়েছে। ভারতেই সেন্ট্রাল ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম (Central National Herbarium)-এর কাছে রয়েছে প্রায় ৩২৮০টি বড় উদ্ভিদ-চিত্রের সংগ্রহ। যার মধ্যে বিখ্যাত রক্সবার্গ (Roxburgh) চিত্রও রয়েছে। তা সত্ত্বেও আকার, বৈচিত্র্য আর উপস্থাপনার নিরিখে পতঞ্জলির এই সংগ্রহ নিজের আলাদা পরিচিতি গড়ে তুলছে বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।
আচার্য বালকৃষ্ণ জানিয়েছেন, এই হার্বাল আর্ট মিউজিয়াম শুধু ছবির সংগ্রহ নয়, বরং ভারতের আয়ুর্বেদিক ঐতিহ্য, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি আর শিল্পের অভিব্যক্তির এক অনন্য মেলবন্ধন। আগামী প্রজন্মের জন্য জ্ঞান, গবেষণা আর প্রকৃতি সংরক্ষণের অমূল্য অভিজ্ঞান হয়ে থাকবে এটি। এমনটাই দাবি করেছেন তিনি।