আন্দোলনের জেরে শিক্ষামন্ত্রকে বড়সড় পরিবর্তন, এনটিএ-তে কোপের মুখে অন্তত ৪৭ জন আধিকারিক

কলকাতায় ছাত্র বিক্ষোভ (Pic- Saumoy Ghosal)

নিট-ইউজি (NEET-UG) প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে কাঠগড়ায় জাতীয় পরীক্ষা সংস্থা এনটিএ (National Testing Agency)। প্রবল চাপের মুখে এবার সংস্থাটিকে একেবারে ভেঙে দিয়ে নতুন করে গড়ে তোলার পথে হাঁটছে কেন্দ্র। সূত্রের খবর, সংস্থার প্রায় ৪৭ জন আধিকারিককে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর তার প্রথম ধাক্কা ইতিমধ্যেই টের পেয়েছে গোটা শিক্ষামন্ত্রক।

রাতারাতি সরলেন উচ্চশিক্ষা সচিব

বৃহস্পতিবার গভীর রাতে কেন্দ্র সরিয়ে দেয় উচ্চশিক্ষা সচিব বিনীত জোশীকে। সিবিএসই-র (CBSE) প্রাক্তন চেয়ারম্যান, এনটিএ-র প্রথম মহানির্দেশক এবং ইউজিসির (UGC) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, এমন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ সামলানো জোশীকে এবার পাঠানো হয়েছে পঞ্চায়েতি রাজ মন্ত্রকে। তাঁর জায়গায় উচ্চশিক্ষা সচিব হয়েছেন নরেশ কুমার গাংওয়ার, আর স্কুলশিক্ষা সচিবের দায়িত্বে এসেছেন টি কে অনিল কুমার। প্রসঙ্গত, গাংওয়ারের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অতীতেই পরিবারের সদস্যদের অনৈতিক ভাবে ভর্তুকি পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।


তিন দফায় রদবদল

গত দু’মাসে এই নিয়ে তৃতীয়বার বড়সড় রদবদল হল শিক্ষামন্ত্রকে। প্রথমে সিবিএসই-র অন-স্ক্রিন মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় (On-Screen Marking, OSM) ত্রুটি ও উত্তরপত্র ঝাপসা হওয়ার অভিযোগে সরানো হয় বোর্ডের চেয়ারম্যান রাহুল সিংহ ও সচিব হিমাংশু গুপ্তকে। এরপর সরানো হয় মন্ত্রকের মিডিয়া ও যোগাযোগ শাখার প্রধান আঁচল কাটিয়ারকে। আর এবার নিট-ইউজি প্রশ্নফাঁস নিয়ে দেশজুড়ে ছাত্র বিক্ষোভের আঁচ গিয়ে পড়ল একেবারে সচিব পর্যায়ে।

শিকড় কতটা গভীর

চলতি বছরের ৩ মে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ঘিরে তোলপাড় হয় গোটা দেশ। ২২ লক্ষেরও বেশি পরীক্ষার্থী এই ঘটনায় বিপাকে পড়েন। ২১ জুন ফের পরীক্ষা নেওয়া হয়। সিবিআই তদন্তে উঠে আসে রাজস্থান, মহারাষ্ট্র-সহ একাধিক রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা একটি সংগঠিত প্রশ্নফাঁস চক্রের কথা, যেখানে এনটিএ-র অন্দরের কারও যোগসাজশ থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তদন্তকারীরা। এই আবহেই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা দাবি করে সরব হয়েছে বিরোধীরা, আর যন্তরমন্তরে ছাত্র সংগঠনগুলির বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে ছোট শহর পর্যন্ত।

বাংলায় পড়েছে আঁচ

এই গোটা সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) হাজার হাজার মেডিক্যাল পড়ুয়ার ভবিষ্যতের ওপরও। প্রতি বছর রাজ্য থেকে লক্ষাধিক পড়ুয়া নিট-ইউজিতে বসেন, আর অতীতেও ফলাফল ও ভর্তি প্রক্রিয়ায় দেরি হওয়ার প্রতিবাদে সল্টলেকে বিকাশ ভবনের সামনে বিক্ষোভে নেমেছিলেন রাজ্যের ছাত্রছাত্রীরা। রাজ্যের শিক্ষামহলের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত এই ধরনের পরীক্ষায় বারবার ত্রুটি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মফস্‌সল ও গ্রামীণ এলাকার পড়ুয়ারা, যাঁদের কাছে নিট পাশ করাই ডাক্তারি পড়ার একমাত্র রাস্তা। এনটিএ-র এই ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ সফল হলে তার সরাসরি সুফল পাওয়ার কথা বাংলার মতো রাজ্যগুলিরই, যেখানে প্রতি বছর প্রশ্নফাঁস বা কারিগরি গোলযোগের আশঙ্কায় পরীক্ষার আগে পড়ুয়া ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তুঙ্গে ওঠে।

আগামী দিনে কী হতে চলেছে

সূত্রের দাবি, শুধু ব্যক্তিবদল নয়, এনটিএ-র সংগঠন, পরিকাঠামো, প্রযুক্তি এবং পরীক্ষা পরিচালনার গোটা পদ্ধতিই আমূল বদলে ফেলার পরিকল্পনা করছে কেন্দ্র। আগামী বছর থেকে নিট-ইউজি একদিনের বদলে পাঁচ থেকে ছয় দিন ধরে, কম্পিউটার-ভিত্তিক পদ্ধতিতে (computer-based test) এবং প্রায় হাজারখানেক কেন্দ্রে নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে বলেও জানা যাচ্ছে। ২০২৪ সালে একইরকম বিতর্কের সময়ে তৎকালীন এনটিএ মহানির্দেশক সুবোধ কুমার সিংহকেও এভাবেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ফলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে কি না, সেই প্রশ্নও ঘুরছে শিক্ষামহলে।