জাতীয় পতাকা ওড়াতে পুলিশের অনুমতি লাগে নাকি? আটক-কাণ্ডে দিল্লি হাইকোর্টে ছাত্রনেত্রী নেহা বোরার তীব্র সওয়াল-জবাব

Neha Bora Protest Against SIR (Image: X/@Gabbar0099)

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের পতন বা ক্ষমতা বদলের (regime change) ডাক দেওয়া কোনও অপরাধ হতে পারে না। বৃহস্পতিবার দিল্লি হাইকোর্টে স্পেশাল এগজিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের (Special Executive Magistrate-SEM) দেওয়া দশ হাজার টাকার শান্তিরক্ষার বন্ডের নোটিসকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এভাবেই সওয়াল করলেন বামপন্থী ছাত্র সংগঠন আইসার (AISA) সর্বভারতীয় সভানেত্রী নেহা বোরা (Neha Bora)। পাল্টা কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লি পুলিশের তরফে সওয়াল করা হয়, গণতন্ত্রে শাসনবদল ঘটে ব্যালট বাক্সে ভোটের মাধ্যমে, রাজধানীর বুকে বিশৃঙ্খল ভিড় পাকিয়ে নয়। দু’পক্ষের প্রায় আড়াই ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস সওয়াল-জবাব শোনার পর রায়দান স্থগিত রেখেছেন দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি সুব্রমনিয়ম প্রসাদ (Justice Subramonium Prasad)। শুক্রবার সন্ধ্যা ছ’টায় এই মামলার চূড়ান্ত নির্দেশ ঘোষণা করবে আদালত।

মান্ডি হাউসে আটক

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ায় কারচুপির অভিযোগে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ককরোচ জনতা পার্টি (CJP) ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের বিক্ষোভে উত্তপ্ত রাজধানী। গত ১৬ অক্টোবর কনট প্লেসে লহরা দো তিরঙ্গা সমাবেশের দিন বিকেল পাঁচটায় মান্ডি হাউস চত্বরে পৌঁছনোর দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যেই নেহা বোরাকে আটক করেছিল দিল্লি পুলিশ। পরদিন ১৭ অক্টোবর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হলেও ১৮ অক্টোবর পুলিশের তরফে তাঁর হাতে একটি শো-কজ নোটিস ধরানো হয়।


 ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (Bharatiya Nagarik Suraksha Sanhita-BNSS) ১২৬, ১৩০ এবং ১৩৫(৩) ধারায় স্পেশাল এগজিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের জারি করা ওই নোটিসে নির্দেশ দেওয়া হয়, তদন্ত চলাকালীন শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার গ্যারান্টি হিসেবে নেহাকে দশ হাজার টাকার ব্যক্তিগত বন্ড (peace bond) এবং একজন জামিনদার পেশ করতে হবে। পাশাপাশি আইসার অভিযোগ, ১৬ অক্টোবর ছাড়া পাওয়ার পর থেকেই সাদা পোশাকের পুলিশকর্মীরা নেহার পিছু নিচ্ছেন এবং তাঁকে ভয় দেখানোর চেষ্টা চলছে। সংবিধানের ১৯ ও ২১ অনুচ্ছেদে দেওয়া মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে এই নোটিস খারিজের দাবিতে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন ছাত্রনেত্রী।

এজলাসে প্রবল তরজা

 বৃহস্পতিবার বিচারপতি সুব্রমনিয়ম প্রসাদের এজলাসে নেহা বোরার হয়ে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন (Gopal Sankaranarayanan) এবং আইনজীবী অভীক চিমনি। শঙ্করনারায়ণনের দাবি, পুলিশের নোটিসটি সম্পূর্ণ যান্ত্রিকভাবে এবং কাট-পেস্ট পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়েছে, যা আইনের চোখে অচল। নোটিসে দাবি করা হয়েছে যে নেহা কনট প্লেসে বিনা অনুমতিতে জাতীয় পতাকা ওড়ানোর ডাক দিয়েছিলেন। অথচ নেহার সমাজমাধ্যমের পোস্টে শুধুমাত্র মান্ডি হাউসে বিকেল পাঁচটায় জমায়েতের কথা বলা হয়েছিল, কোনও হিংসা বা আইন ভাঙার উসকানি সেখানে ছিল না। দিল্লি পুলিশকে তীব্র কটাক্ষ করে শঙ্করনারায়ণন আদালতে বলেন, স্বাধীন ভারতে জাতীয় পতাকা ওড়ানোর জন্য নাগরিকদের পুলিশের অনুমতি নিতে হয় না, বরং দিল্লি পুলিশেরই আইনের পাঠ নেওয়া প্রয়োজন।

 এর পরেই কেন্দ্র ও দিল্লি পুলিশের হয়ে আসরে নামেন অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল চেতন শর্মা (ASG Chetan Sharma)। পুলিশের নথির ১১ ও ১২ নম্বর ক্রমিক সংখ্যার উল্লেখ করে তিনি আদালতে জানান, সিজেপি নেতৃত্ব এবং প্রশান্ত ভূষণের সঙ্গে একটি বৈঠকে নেহা বোরা উপস্থিত ছিলেন, যেখানে সরাসরি বলা হয়েছিল যে এই লড়াই ক্ষমতা বদলের লড়াই এবং তাঁরা বদল ঘটিয়েই ছাড়বেন। এর জবাবেই গোপাল শঙ্করনারায়ণন সপাটে জানান, গণতন্ত্রে শাসক বদলের দাবি তোলায় কোনও ভুল বা বেআইনি কিছু নেই। চেতন শর্মা পাল্টা আপত্তি জানিয়ে বলেন, শাসকের বদল ভোটের মাধ্যমেই হতে পারে, দিল্লির রাজপথে একদল উচ্ছৃঙ্খল মানুষের জমায়েত করে তা করা যায় না। তাঁর আরও দাবি, নেহার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই ছ’টি এফআইআর রয়েছে এবং তিনি পর পর বারো বার নিয়ম ভেঙেছেন। ফলে তাঁকে ধোয়া তুলসীপাতা বলে ধরে নেওয়া যায় না এবং শহরের শান্তি বজায় রাখতে তাঁকে বন্ড দিতেই হবে।

খারাপ ছেলে বনাম ভালো ছেলে

 শুনানি চলাকালীন স্পেশাল এগজিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নোটিসের ভাষা ও পদ্ধতি নিয়ে একাধিক মৌলিক প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি সুব্রমনিয়ম প্রসাদ। আদালতের প্রশ্ন, ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৩৫(৩) ধারা অনুযায়ী প্রাথমিক অনুসন্ধান বা ইনকোয়ারি শেষ করার আগেই ম্যাজিস্ট্রেট কীভাবে বন্ড দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা স্থির করে ফেললেন? তদন্ত চলাকালীন কাউকে শান্তিরক্ষার বন্ড দিতে বাধ্য করা কার্যত তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কাউকে সাসপেন্ড বা নিলম্বিত করার শামিল।

 ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সামাজিক সম্মানের প্রশ্নে বিচারপতি প্রসাদের তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ, মামলাকারীর মূল উদ্বেগ হল তাঁকে ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রের চোখে একজন খারাপ মানুষ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এখন তাঁকে মুচলেকা দিয়ে বলতে বাধ্য করা হচ্ছে যে তিনি ভালো হয়ে থাকবেন। যখনই একজন নাগরিককে আদালতে দাঁড়িয়ে ভালো আচরণের প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য করা হয়, তখনই ধরে নেওয়া হয় যে তিনি এত দিন খারাপ আচরণ করছিলেন। এই যে সামাজিক কলঙ্ক বা তকমা (stigma), তা সরাসরি সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকারকে আঘাত করে। আগামী শনিবার স্পেশাল এগজিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নেহার হাজিরার পরবর্তী তারিখ রয়েছে, তার আগেই শুক্রবার সন্ধ্যায় হাইকোর্ট এই বিষয়ে রায় ঘোষণা করবে।