NALSAR-কাণ্ডে বার কাউন্সিলকে তীব্র ভর্ৎসনা CJI সূর্য কান্তের: কিন্তু দাদাগিরি করা মনন মিশ্র কেন ছাড় পাবেন?

Bar Council Chairman Manan Mishra Lands In NALSAR Controversy (AI Retouched)

দেশের আইনশিক্ষা এবং বিচার ব্যবস্থার পারস্পরিক সম্পর্কে এমন সংঘাত সাম্প্রতিক কালে দেখা যায়নি। হায়দরাবাদের ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ লিগাল স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চের (NALSAR) পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার (Bar Council of India বা BCI) জারি করা একটি নির্দেশ ঘিরে শুক্রবার তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। খোদ প্রধান বিচারপতি (Chief Justice of India বা CJI) সূর্য কান্ত এই নির্দেশের বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বার কাউন্সিলকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এই বিতর্কে আগ বাড়িয়ে কাউন্সিল কেন পদক্ষেপ করছে! তাদের কোনও ভূমিকাই নেই। প্রশ্নটা হল, কোনও এক বিশেষ শক্তির কাছে নিজেকে গরিমান্বিত করতেই কি বার কাউন্সিলের কর্তা মনন মিশ্র নালসার-এর ২০২৬ সালের পুরো ব্যাচকেই ব্যান করার এমন বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন? এমন আত্মঘাতী ও গণতন্ত্রবিরোধী পদক্ষেপের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থাই বা কেন নেওয়া হবে না, এই প্রশ্নও উঠছে।

বিতর্কের সূত্রপাত

ঘটনার শুরু কয়েক দিন আগে। NALSAR ২০২৬ ব্যাচের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রধান বিচারপতিকে আমন্ত্রণ জানানোর প্রস্তাব ওঠে। কিন্তু চারশোরও বেশি পড়ুয়া সেই আমন্ত্রণের বিরুদ্ধে সরব হন। তাঁদের অভিযোগ, দিল্লির যন্তর মন্তরে (Jantar Mantar) পড়ুয়াদের বিক্ষোভ চলাকালীন পুলিশি বাড়াবাড়ির প্রমাণ হিসেবে জমা দেওয়া ভিডিও দেখতে অস্বীকার করেছিলেন প্রধান বিচারপতি। এবং তাঁর কিছু মন্তব্যেও পড়ুয়াদের প্রতি সহানুভূতির অভাব প্রকাশ পেয়েছিল বলে তাঁদের দাবি। এই ক্ষোভ থেকেই তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে চিঠি লিখে আমন্ত্রণ পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান।


আরও পড়ুন: সমাবর্তনে চিফ জাস্টিসকে বয়কটের জের, NALSAR-এর ২০২৬ ব্যাচের কাউকে অ্যাডভোকেট হিসেবে লাইসেন্স দেবে না বার কাউন্সিল

বার কাউন্সিলের নির্দেশ

এই ছাত্র-প্রতিবাদের জেরেই ১৩ আগস্ট এক অভাবনীয় পদক্ষেপ করে বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া। সংগঠনের চেয়ারম্যান মনন কুমার মিশ্রের নির্দেশে জারি হওয়া এক সার্কুলারে (circular) বলা হয়, NALSAR-এর ২০২৬ ব্যাচের কোনও পড়ুয়াকে দেশের কোনও কোর্টে আইনজীবী হিসেবে নথিভুক্ত করা হবে না। ওই সার্কুলারে এমনও অভিযোগ তোলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক নাকি পড়ুয়াদের প্ররোচিত করে বিভ্রান্ত করছেন। তবে বিতর্ক তীব্র হতেই ঘণ্টা কয়েকের মধ্যেই সেই নির্দেশ প্রত্যাহার করে নেয় বার কাউন্সিল।

প্রধান বিচারপতির কড়া বার্তা

শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টে (Supreme Court) এক শুনানিতে বিষয়টি তোলেন বর্ষীয়ান আইনজীবী কে পরমেশ্বর। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চের সামনে তিনি সওয়াল করেন, কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার এক্তিয়ারই নেই বার কাউন্সিলের। জবাবে প্রধান বিচারপতি নিজেই স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এই বিষয়ে বার কাউন্সিলের কোনও ভূমিকা নেই। ছাত্রছাত্রীরা তাঁকে চিঠি লিখেছেন, এটা পড়ুয়াদের আর তাঁর অভ্যন্তরীণ বিষয়, বার কাউন্সিল অহেতুক এতে নাক গলাচ্ছে কেন! নিজের ছাত্রজীবনের কথা স্মরণ করে তিনি আরও বলেন, এমনকি তাঁদের বক্তব্য যদি ভুলও হয়, তবুও শান্তিপূর্ণ ভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার পড়ুয়াদের রয়েছে।

প্রধান বিচারপতি সাফ নির্দেশ দেন, বার কাউন্সিলের সার্কুলারটি নিয়ে জবাব দিতে হবে, আর ততক্ষণ কোনও পড়ুয়া বা শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। প্রধান বিচারপতি NALSAR-এর পড়ুয়াদের উদ্দেশে বলেন, তাঁরা যেন দ্রুত লাইসেন্স নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বারে যোগ দেন, লিগ্যাল এইড মামলায় তাঁদের কাজের সুযোগ দেওয়া হবে, এটাই হবে তাঁদের কেরিয়ারে বাধা তৈরির চেষ্টাকারীদের প্রতি যোগ্য জবাব।

পশ্চিমবঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

এই বিতর্ক শুধু হায়দরাবাদের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ নেই। দেশ জুড়ে আইনজীবী নথিভুক্তির (enrolment) নিয়ন্ত্রক সংস্থা বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া, আর তার অধীনেই কাজ করে পশ্চিমবঙ্গ বার কাউন্সিলও। কলকাতার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ জুরিডিক্যাল সায়েন্সেস (NUJS) থেকে শুরু করে রাজ্যের অন্যান্য আইন কলেজের পড়ুয়াদের কাছে এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। ক্যাম্পাসে মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং পেশাগত নথিভুক্তির সঙ্গে তাকে জুড়ে দেওয়ার প্রবণতা, এই দুইয়ের সীমারেখা কোথায়, সেই প্রশ্নেই এখন স্পষ্ট অবস্থান নিল দেশের শীর্ষ আদালত। ভবিষ্যতে কোনও রাজ্যের বার কাউন্সিল যদি একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়, তা হলে এই রায়ই হয়ে উঠবে নজির। আর প্রশ্ন উঠবে চেয়ারম্যান মনন মিশ্রের অযৌক্তিক দাদাগিরি নিয়েও।