Explained: মুঙ্গেরের এই গাছের বয়স ৭০০ বছর, তাহলে বোটানিক্যাল গার্ডেনের প্রাচীন বটবৃক্ষ কত বুড়ো?

মুঙ্গেরের ৭০০ বছরের বুড়ো বটগাছ (x.com/IndexBihar)

গাছের বয়স বলতে গেলে এতদিন ভরসা ছিল লোককথা আর আন্দাজের উপর। কিন্তু বিহারের মুঙ্গেরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বিশালাকার বটগাছ (Banyan Tree) এবার নিজের আসল বয়সের প্রমাণ দিল একেবারে বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে। রেডিওকার্বন ডেটিং (Radiocarbon Dating) পদ্ধতিতে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন, এই গাছের বয়স প্রায় ৭০০ বছর। শুধু তাই নয়, এটাই এখনও পর্যন্ত বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত সবচেয়ে বুড়ো বটগাছ।

কী পাওয়া গিয়েছে মুঙ্গেরে

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গ্রামের চাতালে ছায়া দিয়ে আসা, পথিকদের বিশ্রামস্থল হয়ে ওঠা বটগাছ ভারতীয় সমাজজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই ধরনের গাছের প্রকৃত বয়স জানার কোনও নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এতদিন ছিল না। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় চওড়া পাতার গাছে কোনও স্পষ্ট বার্ষিক বৃদ্ধিবলয় তৈরি হয় না বলে, প্রচলিত ডেন্ড্রোক্রোনোলজি (Dendrochronology) পদ্ধতিও এখানে কাজ করে না। এই হাধা দূর করতে বিহার বন দপ্তরের আমন্ত্রণে এগিয়ে আসেন লখনউয়ের বীরবল সাহনি পুরাবিজ্ঞান সংস্থার (Birbal Sahni Institute of Palaeosciences) বিজ্ঞানী ড. তৃণা বসু।


কীভাবে মাপা হল বয়স

ড. বসুর নেতৃত্বে ড. মায়াঙ্ক শেখর এবং ড. অখিলেশ যাদবকে নিয়ে তৈরি গবেষক দল গাছের একটি দ্বিতীয় কাণ্ড এবং সবচেয়ে পুরনো প্রধান শাখার কেন্দ্রের কাছ থেকে কাঠের নমুনা সংগ্রহ করেন। সেই নমুনা থেকে বার করা হয় অ্যালফা-সেলুলোজ, যা উদ্ভিদকোষ প্রাচীরের সবচেয়ে স্থিতিশীল উপাদান হিসেবে পরিচিত। এরপর অ্যাক্সিলেরেটর মাস স্পেকট্রোমেট্রি (Accelerator Mass Spectrometry বা AMS) পদ্ধতিতে নির্ভুল রেডিওকার্বন ডেটিং করা হয়। ফলাফল যাচাই করা হয় ইন্টক্যাল টোয়েন্টি (IntCal20) ক্যালিব্রেশন কার্ভ এবং অক্সক্যাল (OxCal) সফটওয়্যারের মাধ্যমে। এই গোটা প্রক্রিয়াতেই উঠে আসে গাছের প্রকৃত বয়স। ৭০০ বছর।

পুরনো ধারণা এবার বাতিল

এতদিন মনে করা হত, এই বটগাছ বড়া বাংলো (Burra Bangla) নামের একটি ঔপনিবেশিক আমলের ভবনের সামনে রোপণ করা হয়েছিল। স্থাপত্যশৈলী অনুযায়ী সেই ভবনের বয়স আন্দাজ করা হত প্রায় তিনশো থেকে সাড়ে তিনশো বছর। কিন্তু বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে দেখা গেল, গাছটি ওই বড়া বাংলোর চেয়েও কয়েক শতাব্দী পুরনো। বিজ্ঞানীদের অনুমান, এই বটগাছ আসলে সেই প্রাকৃতিক জঙ্গলেরই জীবন্ত অবশেষ, যা একদিন ওই এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে ছিল এবং সেটা ভবন তৈরির অনেক আগে থেকেই।

গবেষণা প্রকাশিত

এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান জার্নাল কোয়াটারনারি রিসার্চে (Quaternary Research)। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রকের (Department of Science and Technology বা DST) অধীনস্থ এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীদের মতে, এই পদ্ধতি শুধু ভারতে নয়, গোটা বিশ্বের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রাচীন গাছেদের বয়স নির্ধারণেও কাজে লাগতে পারে।

আন্তর্জাতিক গুরুত্ব কতটা

এই গবেষণা শুধু একটা গাছের বয়স জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সরকার, বনদপ্তর এবং সংরক্ষণ সংস্থাগুলিকে সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন গাছ চিহ্নিতকরণ ও সংরক্ষণে সাহায্য করবে এই পদ্ধতি। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, ঐতিহ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ শিক্ষা এবং অতীতের জলবায়ু ও ঐতিহাসিক পরিমণ্ডল বোঝার ক্ষেত্রেও এটা নতুন দিশা দেখাতে পারে বলে মত গবেষকদের।

নামের মধ্যেই লুকিয়ে বাংলার পরিচয়

মজার বিষয় হল, এই বটগাছের বৈজ্ঞানিক নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলার শিকড়। বটগাছের প্রজাতিগত নাম ফাইকাস বেঙ্গালেনসিস (Ficus benghalensis), যার অর্থ আক্ষরিক অর্থেই বাংলার বট। উল্লেখ্য, ভারতের জাতীয় বৃক্ষও এই বটগাছ। ফলে মুঙ্গেরের এই আবিষ্কারের সঙ্গে বাংলার একটা নিবিড় সংযোগ থেকেই যাচ্ছে, নামের সূত্র ধরেই।

হাওড়ার সেই বিখ্যাত বটগাছ

এই খবর পড়ে অনেকেরই মনে পড়বে হাওড়ার আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ইন্ডিয়ান বোটানিক গার্ডেনের (Acharya Jagadish Chandra Bose Indian Botanic Garden) সেই বিশ্ববিখ্যাত গ্রেট ব্যানিয়ান ট্রি-র (Great Banyan Tree) কথা। শতাব্দীপ্রাচীন এই গাছটিও বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত ছাউনির গাছ হিসেবে ১৯৮৯ সালে গিনেস বুকে জায়গা করে নিয়েছিল। ১৮৬৪ ও ১৮৬৭ সালের দুটি ঘূর্ণিঝড়ে এবং ছত্রাক সংক্রমণের জেরে ১৯২৫ সালে গাছটির মূল কাণ্ড কেটে বাদ দিতে হয়েছিল, তারপরেও প্রায় সাড়ে তিন হাজারের বেশি ঝুরি নিয়ে আজও ছোট্ট এক জঙ্গলের চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। মুঙ্গেরের বটবৃক্ষটির মতো হাওড়ার এই ঐতিহাসিক গাছটির প্রকৃত বয়সও কি একদিন এই একই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে যাচাই করা হবে? উত্তর লোকানো ভবিষ্যতের গর্ভেই।