প্রেমের সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল মৃত্যুর কারণ। প্রেমিকাকে খুন করে দেহ টুকরো টুকরো করে যমুনা নদীর ধারে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠল এক যুবকের বিরুদ্ধে। উত্তরপ্রদেশের আগরায় এই মর্মান্তিক ঘটনায় ইতিমধ্যেই অভিযুক্ত বিনয় সিংহকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই অফিসে কাজ করতে গিয়ে প্রেমের সম্পর্ক, সন্দেহ, মানসিক অস্থিরতা এবং শেষ পর্যন্ত নৃশংস হত্যাকাণ্ড— সব মিলিয়ে ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে গোটা এলাকায়।
নিহত তরুণীর নাম মিঙ্কি শর্মা (৩২)। পেশায় তিনি আগরার একটি বেসরকারি সংস্থার হিউম্যান রিসোর্স বিভাগের ম্যানেজার ছিলেন। আর ওই সংস্থাতেই কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন অভিযুক্ত বিনয় সিংহ। সেখান থেকেই দু’জনের পরিচয়, বন্ধুত্ব এবং পরে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রায় দু’বছর ধরে তাঁদের সম্পর্ক চলছিল। কিন্তু গত ছয় মাস ধরে সেই সম্পর্কে তিক্ততা ও সন্দেহ তৈরি হচ্ছিল। পরিবারের সদস্যদের দাবি, মিঙ্কি অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন বলে সন্দেহ করতেন বিনয়। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, সেই সন্দেহ থেকেই জন্ম নেয় ভয়ঙ্কর অপরাধের পরিকল্পনা।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ২৩ জানুয়ারি মিঙ্কির সঙ্গে তীব্র তর্কাতর্কি হয় বিনয়ের। সেই সময় রাগের বশে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তরুণীর ঘাড়ে কোপ বসান তিনি। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় মিঙ্কির। এরপর প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে দেহ তিন টুকরো করে ফেলে অভিযুক্ত। পরিচয় গোপন রাখতে দেহ থেকে মুণ্ড আলাদা করে ফেলেন তিনি। দেহের বাকি অংশ কোমর থেকে দু’ভাগে কেটে প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভরেন। মুণ্ডটি ভরেন পিঠের ব্যাগে। পরে যমুনা নদীর উপর একটি সেতুর কাছে দেহাংশ ভর্তি প্যাকেটটি ফেলে দেন। তরুণীর পরনের জামাকাপড়, মুণ্ড ও ব্যাগটি ফেলে দেওয়া হয় অন্য একটি নির্জন এলাকায়।
নিহতের পরিবারের দাবি, ২৩ জানুয়ারি দুপুর দু’টো নাগাদ অফিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন মিঙ্কি। তারপর থেকে আর বাড়ি ফেরেননি তিনি। মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ আরও তীব্র হয়। থানায় নিখোঁজের অভিযোগ দায়ের করা হলে খোঁজ শুরু করে পুলিশ।
২৪ জানুয়ারি রাত প্রায় একটার সময় যমুনা নদীর ধারে একটি প্লাস্টিকের প্যাকেট পড়ে থাকতে দেখে সন্দেহ হয় পুলিশের টহলদার দলের। প্যাকেট খুলতেই বেরিয়ে আসে দু’টি পা এবং কোমর থেকে গলা পর্যন্ত দেহাংশ। প্রথমে দেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে পরিচয় নিশ্চিত হলেও তরুণীর মুণ্ড পাওয়া যায়নি। এখনও পর্যন্ত সেই মুণ্ড উদ্ধার হয়নি, তল্লাশি চলছে।
ঘটনার তদন্তে পাঁচটি আলাদা দল গঠন করে পুলিশ। খতিয়ে দেখা হয় এলাকার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ। ফুটেজে দেখা যায়, এক ব্যক্তি স্কুটারে এসে সেতুর কাছে একটি ব্যাগ ফেলে যাচ্ছে। সেই সূত্র ধরেই বিনয় সিংহকে চিহ্নিত করা হয়। গ্রেপ্তার করে জেরা শুরু করলে ধৃত অপরাধের কথা স্বীকার করে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
পুলিশি জেরায় বিনয় জানায়, তরুণীর মুণ্ড, জামাকাপড় ও মোবাইল-সহ ব্যাগটি একটি নির্জন এলাকায় নর্দমার কাছে ফেলে দিয়েছে সে। সেই জায়গায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে খুন এবং তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগে মামলা রুজু করা হয়েছে।
এই নৃশংস ঘটনায় গোটা আগরা জুড়ে আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রেম, সন্দেহ আর হিংসার এই ভয়াবহ পরিণতি আবারও প্রশ্ন তুলে দিল— সম্পর্কের টানাপোড়েনে মানুষ কীভাবে ধীরে ধীরে অমানবিক হয়ে ওঠে। আর সেই অমানবিকতাই শেষ পর্যন্ত জন্ম দেয় এমন ভয়ংকর অপরাধের।