বছরের পর বছর কঠিন শ্রম, লাগাতার পড়াশোনা। হাজার হাজার টাকার কোচিং। মা-বাবার চোখের ঘুম উড়িয়ে রাত জাগা। শেষমেশ পরীক্ষার ঠিক আগের রাতে খবর এল, পরীক্ষাই হচ্ছে না।
এ যন্ত্রণার কোনও হিসেব নেই।
মহারাষ্ট্রে (Maharashtra) শনিবার, ২৭ জুন ঠিক এটাই হল। রোববার ২৮ জুন মহারাষ্ট্র শিক্ষক যোগ্যতা পরীক্ষা (Teacher Eligibility Test, TET) ২০২৬ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে জানা গেল, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গিয়েছে। NEET বিতর্কের রেশা না থামতেই ফের আর এক প্রশ্নফাঁসের জেরে স্বভাবতই জমেছে তীব্র বিতর্ক।
কী হয়েছিল ভিওয়ান্ডিতে?
শনিবার ভোরবেলা। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে ভিওয়ান্ডি (Bhiwandi) পুলিশ হানা দিল এক জায়গায়। সেখানে কয়েকজনের কাছে পাওয়া গেল সেই প্রশ্নের কাগজ, যা আগামীকাল হওয়ার কথা ছিল।
পুলিশ তৎক্ষণাৎ মহারাষ্ট্র স্টেট কাউন্সিল অব এগজামিনেশন (Maharashtra State Council of Examination, MSCE)-এর আধিকারিকদের ডাকল। আসল প্রশ্নপত্রের সঙ্গে মেলানো হল। একটা, দুটো নয়, একাধিক প্রশ্ন হুবহু মিলে গেল।
সন্দেহ নয়, নিশ্চিত হয়ে গেল ফাঁসের ঘটনা।
তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রাজিব শাহ (বিহার), আকাশ কুমার (বিহার) এবং ধীরজ কুমার (হরিয়ানা)। পুলিশ বলছে, এই চক্রের (network) আরও লোক আছে। তদন্ত চলছে।
পরীক্ষা স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে অনির্দিষ্টকালের জন্য।
শুধু টেট নয়, নিটের ছায়া আরও দীর্ঘ
মহারাষ্ট্রের এই ঘটনা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মাত্র দেড় মাস আগে জাতীয় স্তরে ঘটে গিয়েছে আরও বড় বিপর্যয়।
৩ মে ২০২৬। ২২ লক্ষেরও বেশি ছাত্রছাত্রী বসেছিল নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষায়, সারা দেশ জুড়ে। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে।
৯ দিন পরে, ১২ মে, সব শেষ হয়ে গেল। ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (National Testing Agency, NTA) ঘোষণা করল, পরীক্ষা বাতিল। কারণ, প্রশ্নপত্র আগেই বেরিয়ে গিয়েছিল।
তারপরের ঘটনা আরও কঠিন।
অন্তত ১৯ জন ছাত্রছাত্রীর আত্মহত্যার কথা জানা গিয়েছে। রাজস্থানের সিকর থেকে দিল্লি, নাগপুর থেকে কোয়েম্বাটোর, ক্লান্ত-ভাঙাচোরা তরুণ-তরুণীরা আর পারেননি জীবনের গ্লানি বহন করতে। কেউ তৃতীয়বারের মতো পরীক্ষা দিয়েছিলেন। কেউ ৬৫০-র বেশি নম্বর পাওয়ার আশায় ছিলেন। সবার স্বপ্ন মুছে গেল মাঝরাতের একটা ঘোষণায়।
পুনে (Pune) থেকে গ্রেফতার হলেন রসায়নের অধ্যাপক পিভি কুলকার্নি (P. V. Kulkarni)। আর এক অভিযুক্ত, বিজ্ঞানের অধ্যাপিকা মনীষা গুরুনাথ মান্ধারে (Manisha Gurunath Mandhare)। সিবিআই (CBI) তদন্তে জানা গিয়েছে, বিশেষ ক্লাসে পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন বলে দেওয়া হত মুখস্থ করিয়ে। কাগজে নোট নেওয়া হত। তারপর সেই নোটই ছড়িয়ে পড়ত রাজস্থান, মহারাষ্ট্র জুড়ে।
শেষপর্যন্ত ২১ জুন পুনরায় পরীক্ষা হল। কিন্তু সেই পরীক্ষার আগেও জাল ফাঁসের খবর ছড়াল সোশাল মিডিয়ায়। মিথ্যে বলে দাবি করল এনটিএ। তবু ভারত সরকার মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম টেলিগ্রাম (Telegram) সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিল আতঙ্কে।
‘পেপার লিক সরকার‘, বলছে বিরোধীরা
মহারাষ্ট্রের টেট প্রশ্ন ফাঁসের খবর ছড়াতেই আক্রমণে নেমেছে কংগ্রেস (Congress)।
সামাজিক মাধ্যমে পার্টির তরফে তীক্ষ্ণ পোস্ট করা হয়েছে। বক্তব্য, ‘আরও একটা প্রশ্ন ফাঁস। বিজেপি (BJP) সরকারের আমলে এমন কোনও পরীক্ষা নেই, যার প্রশ্ন ফাঁস হয়নি। এই সরকার এখন পরিচিত হোক পেপার লিক সরকার নামে।’
কংগ্রেস নেতা পবন খেড়া (Pawan Khera) বলছেন, মোদি সরকারের আমলে প্রায় ৯০টি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে।
<blockquote class=”twitter-tweet”><p lang=”en” dir=”ltr”>The Modi government seems determined to score a shameful century. It has already presided over nearly 90 exam paper leaks. Today, another has been reported – this time in Maharashtra, where tomorrow's TET examination has been cancelled after the paper was leaked.<br><br>The so-called… <a href=”https://t.co/RH3hLA76Ya”>https://t.co/RH3hLA76Ya</a></p>— Pawan Khera 🇮🇳 ಪವನ್ ಖೇರಾ (@Pawankhera) <a href=”https://x.com/Pawankhera/status/2070800305680478426?ref_src=twsrc%5Etfw”>June 27, 2026</a></blockquote> <script async src=”https://platform.x.com/widgets.js” charset=”utf-8″></script>
শিবসেনা (উদ্ধব গোষ্ঠী) নেতা অম্বাদাস দানবে (Ambadas Danve) বলছেন, ‘নিটের প্রশ্ন ফাঁসের কেন্দ্রও ছিল মহারাষ্ট্র। তারপরও সরকার কিছু শেখেনি। টেট ছোট পরীক্ষা হলেও মহারাষ্ট্র সরকার এখানেও ব্যর্থ।’
আর ককরোচ জনতা পার্টির (Cockroach Janta Party, CJP) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে (Abhijeet Dipke), যিনি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের (Dharmendra Pradhan) পদত্যাগের দাবিতে অনশনে বসে আছেন, প্রশ্ন ছুঁড়েছেন, ‘এই দেশে আর কোনও পরীক্ষা বাকি আছে, যেটা ফাঁস না হয়ে শেষ হয়েছে?’
প্রশ্নটা আসলে আরও গভীর
ঘটনার পর পরীক্ষা স্থগিত, গ্রেপ্তার, তদন্ত, এই চক্রটা বারবার ঘুরছে। কিন্তু শিকড়ের প্রশ্নটা কেউ সামনে আনছে না।
ভারতে কোটিরও বেশি তরুণতরুণী লাখ লাখ টাকা খরচ করছে কোচিংয়ে, ডাক্তার বা শিক্ষক হবে বলে। আসন সীমিত, পরীক্ষার্থী অসীম। এই চাপটাই প্রশ্ন ফাঁসের বাজার তৈরি করে। কেউ কিনতে চায়, তাই কেউ বেচতে আসে।
গ্রেফতার হয় কিছু লোক। পরীক্ষা পিছিয়ে যায়। তারপর?
প্রতিটি ফাঁসের পিছনে ঢাকা পড়ে যায় কিছু পরিবারের শেষ সম্বল, অগুনতি স্বপ্নের লাশ। ভিওয়ান্ডিতে তিনজন ধরা পড়েছে। কিন্তু যে ব্যবস্থাটা এই বাজার তৈরি করে, সেটার বিচার কবে হবে?