মহাদেব বেটিং অ্যাপ কাণ্ডে বড়সড় সাফল্য কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার। দীর্ঘদিন ধরে দুবাইয়ে আত্মগোপন করে থাকা এই বেআইনি বেটিং সিন্ডিকেটের অন্যতম মূলচক্রী সৌরভ চন্দ্রকরকে অবশেষে ভারতে ফিরিয়ে আনা হল। ইন্টারপোলের রেড কর্নার নোটিসের ভিত্তিতে ওমান থেকে তাঁকে দেশে ফিরিয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো। তদন্তকারীদের দাবি, ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে এই বেটিং চক্রের মাধ্যমে প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকার বেআইনি লেনদেন হয়েছে। হাওয়ালা মারফত সেই বিপুল অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
গত জুলাই মাসে ইন্টারপোলের রেড কর্নার নোটিসের ভিত্তিতে সৌরভকে আটক করে ওমানের রয়্যাল পুলিশ। এরপর ভারত সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এবং ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাঁকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রত্যর্পণের অনুমতি মেলার পর কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর বিশেষ দল মাসকটে পৌঁছয়। রবিবার তাঁকে ভারতে নিয়ে আসা হয়েছে।
সৌরভের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর দুটি মামলা রয়েছে। পাশাপাশি আর্থিক তছরুপের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চালাচ্ছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটও। দেশে ফেরার পর তাঁর শারীরিক পরীক্ষা করানো হবে। ট্রানজিট রিমান্ড পাওয়ার পর তাঁকে ছত্তীসগঢ়ের রায়পুরে নিয়ে যাওয়া হবে। সোমবার রায়পুরের বিশেষ আদালতে তাঁকে পেশ করার কথা।
কীভাবে চলত মহাদেব বেটিং সিন্ডিকেট?
তদন্তকারীদের দাবি, দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত হত মহাদেব অনলাইন বুক। ক্রিকেট, ফুটবল, তাস-সহ বিভিন্ন খেলার উপর বেআইনি বাজি ধরার সুযোগ করে দেওয়া হত এই অ্যাপের মাধ্যমে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিল এই চক্রের ফ্র্যাঞ্চাইজি প্যানেল। সেগুলির মাধ্যমে নতুন গ্রাহক তৈরি করা হত এবং তাঁদের কাছ থেকে বাজির টাকা সংগ্রহ করা হত।
এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের তদন্ত অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকার অপরাধমূলক লেনদেন হয়েছে। প্রায় ৩২০০টি ফ্র্যাঞ্চাইজি প্যানেলের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে ছিল এই কারবার। প্রতিটি প্যানেল থেকে মাসে গড়ে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করা হত। সব মিলিয়ে মাসিক লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়াত প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা। বার্ষিক হিসাবে সেই অঙ্ক প্রায় ১১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
২০০ কোটির বিয়ের আসর থেকেই সন্দেহ
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুবাইয়ে সৌরভ চন্দ্রকরের রাজকীয় বিয়ের অনুষ্ঠান তদন্তকারীদের নজরে আসে। অভিযোগ, আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে যাওয়ার জন্য নাগপুর থেকে ব্যক্তিগত বিমান ভাড়া করা হয়েছিল। বিয়ের অনুষ্ঠানে বলিউডের একাধিক তারকাকে পারফর্ম করার জন্য বিপুল অর্থ দেওয়া হয়। তদন্তকারীদের দাবি, প্রায় ২০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল ওই অনুষ্ঠানে। সেই অর্থের বড় অংশই হাওয়ালার মাধ্যমে লেনদেন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
তদন্তে উঠে এসেছে, সৌরভ চন্দ্রকর এবং রবি উৎপলের নেতৃত্বে চলত এই বেটিং সিন্ডিকেট। ক্রিকেট, ফুটবল এবং তাসের খেলাকে কেন্দ্র করে বেআইনি জুয়ার কারবার চালানো হত। ভুয়ো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ও হাওয়ালা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ দুবাইয়ে পাঠানো হত বলে অভিযোগ। শুধু তাই নয়, নির্বিঘ্নে এই কারবার চালানোর জন্য প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং সরকারি আধিকারিকদের ঘুষ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সৌরভকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর এই বেটিং সাম্রাজ্যের আর্থিক লেনদেন, বিদেশে অর্থ পাচার এবং এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত আরও গতি পেতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। তবে এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত অন্যদের ভূমিকা এবং আর্থিক লেনদেনের সম্পূর্ণ হিসাব এখনও তদন্তসাপেক্ষ।