সন্তানধারণে অক্ষম, তাই স্ত্রীকে নির্মমতার অভিযোগে ডিভোর্স দেওয়া যাবে না: হাইকোর্ট

Wife's inability to conceive not ground to grant divorce for cruelty: High Court (Image: Pexels/@Gusti Mega)

সন্তান না হলে দায় কি শুধু স্ত্রীর? এই প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব দিল মাদ্রাজ হাইকোর্ট (Madras High Court)। আদালতের মত, কেউ নিঃসন্তান মানেই তিনি স্বতঃসিদ্ধ ভাবে নিষ্ঠুর (cruelty), এমনটা নয়। স্বামীর বিবাহবিচ্ছেদের (divorce) আবেদন খারিজ করে বিচারপতিরা জানিয়েছেন, সন্তান না হওয়াকে নিষ্ঠুরতার অভিযোগ এনে সম্পূর্ণ স্ত্রীর দাম্পত্য-ব্যর্থতা বানিয়ে ফেলা যায় না।

মামলার খুঁটিনাটি

মামলাটি শুনেছে মাদ্রাজ হাইকোর্টের মাদুরাই বেঞ্চের (Madurai Bench) ডিভিশন বেঞ্চ। শুনানির শেষে বিচারপতি জি আর স্বামীনাথন (Justice GR Swaminathan) ও বিচারপতি এম ডি সুমাথি (Justice MD Sumathi) এই রায় দিয়েছেন। প্রথমে স্বামী বিচ্ছেদ চেয়েছিলেন পারিবারিক আদালতে (Family Court)। সেখানে আবেদন খারিজ হয়। তারপরই তিনি হাইকোর্টে আপিল করেন।


স্বামীর অভিযোগ কী

স্বামীর বক্তব্য, দু’জনের বিয়ে হয় ২০০৭ সালে। প্রথম ছ’মাস শান্তিতেই সংসার কেটেছিল। তারপর নাকি স্ত্রীর আচরণ বদলে যায়। স্বামীর অভিযোগ, স্ত্রী নিজের বাপের বাড়িকে উঁচু নজরে দেখতেন এবং তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে হেয় করে কথা বলতেন। অফিস থেকে ফিরতে দেরি হলে সন্দেহ করতেন বলেও দাবি করেন তিনি। প্রকাশ্যে অপমান, মারধর এবং বাপের বাড়ি চলে গিয়ে আর না ফেরার অভিযোগও তোলেন। সঙ্গে ছিল চিকিৎসার পরেও সন্তান না হওয়ার কথা।

স্ত্রীর পাল্টা বক্তব্য

স্ত্রী সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, স্বামীর মদ্যপানের অভ্যাস ছিল। মত্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোয় তিনি শুধু আপত্তি জানিয়েছিলেন। না জানিয়ে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার কথাও মানেননি তিনি। বরং স্বামী বাইরে কাজে গেলে তাঁকে বোনের বাড়িতে রেখে যেতেন বলে জানান। জরায়ুর ফাইব্রয়েডের (fibroid) অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসার কথাও আদালতকে জানান স্ত্রী। তাঁর দাবি, সন্তান না হওয়া তাঁর ইচ্ছাকৃত নয়। নানাবিধ শারীরিক জটিলতার কারণেই, যাতে তাঁর জ্ঞানত কোনও হাত নেই।

আদালত কেন মানল না

বিচারপতিরা প্রথমেই বলেছেন, বিয়ে শুধু সন্তান জন্ম দেওয়ার চুক্তি নয়। সন্তান না হলে স্ত্রীকে দাম্পত্য সম্পর্কে ব্যর্থ ধরে নেওয়া যায় না। আদালতের পর্যবেক্ষণ, স্ত্রী বারবার কষ্টকর প্রজনন চিকিৎসা (fertility treatment) করিয়েছেন। এতে শরীরের ধকল ছিল, মানসিক চাপ ছিল, অনিশ্চয়তাও ছিল। বিচারপতিদের মতে, এই লড়াইই বলে দেয় স্ত্রী সংসার টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। যিনি সংসার ছাড়তে চান, তিনি সাধারণত সংসারে ফেরার ইচ্ছা জানান না। অথচ  এখানে স্ত্রী বারবার ফিরতে চেয়েছেন।

প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ টিকবে না

স্বামীর যুক্তি ছিল, নিষ্ঠুরতা ঘটে চার দেওয়ালের ভিতরে। সেখানে সাক্ষী বা থানায় অভিযোগ মেলে না। হাইকোর্ট এই যুক্তি আংশিক মেনেছে। আদালতের মতে, দাম্পত্য সম্পর্ককে সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে। কোনও বাঁধাধরা ছক চলবে না। কিন্তু প্রমাণহীন অভিযোগ জমতে জমতে আপনা থেকে প্রমাণিত নিষ্ঠুরতা হয়ে যায় না। সুপ্রিম কোর্টের নজির উল্লেখ করে বেঞ্চ জানিয়েছে, আচরণের সম্মিলিত প্রভাব দেখা হয় ঠিকই। তবে তার ভিত্তি হিসেবে প্রতিটি ঘটনা আগে প্রমাণ করতে হবে। পারিবারিক আদালতের সিদ্ধান্তে কোনও ত্রুটি না পেয়ে হাইকোর্ট আপিল খারিজ করেছে।

দীর্ঘদিনের আলাদা থাকাও কি যথেষ্ট নয়

আদালত এটাও স্পষ্ট করেছে, দীর্ঘদিন আলাদা থাকলেই নিষ্ঠুরতা প্রমাণ হয় না। বিয়ে ভেঙে গিয়েছে বলেও ধরে নেওয়া যায় না। স্ত্রী যেখানে সংসারে ফিরতে রাজি, সেখানে এই যুক্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

আগেও কি এমন রায় এসেছে

এসেছে। কয়েক বছর আগে মাদ্রাজ হাইকোর্টেরই অন্য একটি ডিভিশন বেঞ্চ একই ধরনের একটি মামলায় রায় দিয়েছিল। সেখানে স্ত্রীর ওভারিয়ান ক্যানসারের (ovarian cancer) চিকিৎসায় জরায়ু বাদ গিয়েছিল। স্বামী সেই ঘটনাকে মানসিক নিষ্ঠুরতা বলে বিচ্ছেদ চেয়েছিলেন। আদালত জানিয়েছিল, এটা স্ত্রীর ঘটানো কোনও ইচ্ছাকৃত কাজ নয়। এটা নিছক দুর্ভাগ্য। ফলে একে নিষ্ঠুরতা বলা যায় না। দুই রায়ের সুর একই। শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে স্ত্রীর অপরাধ বানানো চলবে না।

পশ্চিমবঙ্গেও প্রাসঙ্গিক

মাদ্রাজ হাইকোর্টের রায় আইনত বাধ্যতামূলক শুধু তামিলনাড়ু ও পুদুচেরিতে। কিন্তু অন্য রাজ্যের আদালতের কাছে এর যুক্তিগত গুরুত্ব থাকে। কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court) বা কলকাতা ও জেলার পারিবারিক আদালতে নিষ্ঠুরতার ভিত্তিতে বিচ্ছেদের মামলা চললে এই যুক্তি সামনে আসতে পারে। দেশের বিবাহ-সংক্রান্ত আইন একই কাঠামোয় চলে। তাই নিঃসন্তান দম্পতিদের ক্ষেত্রে এই রায় একটি জরুরি দিশা দেখাল। বন্ধ্যাত্ব (infertility) বা সন্তানহীনতা (childlessness) নিয়ে স্ত্রীকে দায়ী করার প্রবণতার বিরুদ্ধে আইনি বার্তাও স্পষ্ট। চিকিৎসকরাও বহু বছর ধরে বলে আসছেন, সন্তান না হওয়ার কারণ স্বামী বা স্ত্রী, যে কোনও পক্ষের শরীরে থাকতে পারে। কখনও কারণ থাকে দু’জনেরই। কখনও কোনও কারণই মেলে না। তাই সেটা হাতিয়ার করে বিচ্ছেদ চাওয়া চরম অনৈতিক কাজ।