KYC জটে আটকে পেনশন, বিনা চিকিৎসায় বৃদ্ধের মৃত্যু! ডিজিটাল ভারতের অচেনা অন্ধকার

KYC জটে মৃত্যু (AI নির্মাণ)

ডিজিটাল ভারতের (Digital India) জয়গানে যখন চারদিক উচ্ছ্বসিত, ঠিক তখনই প্রতিবেশী রাজ্য থেকে ভেসে এল এক চরম অমানবিক ও মর্মান্তিক বাস্তব। ব্যাঙ্কের ‘কেওয়াইসি’ (KYC)-র গেরোয় আটকে গিয়েছিল যৎসামান্য পেনশনের টাকা। আর সেই টাকার অভাবেই শেষ পর্যন্ত ওষুধের খরচ জোগাতে না পেরে, বিনা চিকিৎসায় প্রাণ হারাতে হল ৭৫ বছরের এক আদিবাসী বৃদ্ধকে। ঝাড়খণ্ডের গাড়োয়া (Garhwa) জেলার এই ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার অন্ধ গলিকে। একই সঙ্গে এই ট্র্যাজেডি পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ ব্যাঙ্কিং পরিষেবা ও প্রান্তিক উপভোক্তাদের সুরক্ষার ক্ষেত্রেও এক মস্ত বড় সতর্কবার্তা।

e-kyc জটে থমকে গেল জীবন

ঘটনাটি ঘটেছে ঝাড়খণ্ডের গাড়োয়া জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। মৃত বৃদ্ধের নাম রতন লাকড়া (Ratan Lakra)। বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, বার্ধক্যজনিত নানা গুরুতর অসুস্থতায় ভুগছিলেন তিনি। চিকিৎসকের কাছে যাওয়া এবং ওষুধের জন্য জরুরি প্রয়োজন ছিল সামান্য কিছু অর্থের। কিন্তু ব্যাঙ্কে গচ্ছিত পেনশনের টাকা তুলতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, অ্যাকাউন্টের ‘ই-কেওয়াইসি’ (e-KYC) প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত টাকা তোলা যাবে না।


ডিজিটাল ব্যাঙ্কিংয়ের (Digital Banking) নিয়মের ফাঁসে পড়ে এভাবেই আটকে যায় তাঁর শেষ সম্বলটুকু। বারবার ব্যাঙ্কে চক্কর কেটেও বায়োমেট্রিক ডেটা (Biometric Data) এবং আধার কার্ডের (Aadhaar Card) নামের বানানের সামান্য অমিলের কারণে অ্যাকাউন্ট সচল করা সম্ভব হয়নি। শেষমেশ টাকার অভাবে চিকিৎসা থমকে যায় এবং বিনা চিকিৎসায় মারা যান ওই বৃদ্ধ। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে দেশজুড়ে। ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন ইতিমধ্যেই এই ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্তের (High-level Investigation) নির্দেশ দিয়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গের জন্য কেন এটি বড় সতর্কবার্তা?

ঝাড়খণ্ডের এই মর্মান্তিক ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ভাবলে মস্ত বড় ভুল হবে। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ এলাকাতেও এই চিত্র অত্যন্ত চেনা। সরকারের একাধিক জনমুখী প্রকল্প যেমন, ‘বার্ধক্য ভাতা’ (Old Age Pension) বা ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ (Annapurna Yajona)-এর মতো সামাজিক সুরক্ষা স্কিমের (Social Security Schemes) টাকা সরাসরি উপভোক্তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে (Direct Benefit Transfer – DBT) পাঠানো হয়।

প্রান্তিক মানুষের সংকট

রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (Reserve Bank of India – RBI)-র কড়া নির্দেশিকায় ব্যাংকগুলি এখন নির্দিষ্ট সময় অন্তর পর্যায়ক্রমিক কেওয়াইসি (Periodic KYC) আপডেট বাধ্যতামূলক করেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহল বা উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত চা বলয়ের হাজার হাজার প্রবীণ মানুষের কাছে এই প্রক্রিয়া এক দুঃস্বপ্নের মতো।

কোথাও আঙুলের ছাপ বা বায়োমেট্রিক মেলেনি, কোথাও আবার স্থানীয় তথ্যমিত্র কেন্দ্রে ভুল ডেটা এন্ট্রি (Data Entry)-র কারণে আধার ও পাসবুকের নাম আলাদা হয়ে গিয়েছে। ফলে প্রতি মাসেই বহু দরিদ্র মানুষের অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে ফ্রিজ (Frozen Account) হয়ে যাচ্ছে। ঝাড়খণ্ডের এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, নিয়মের জাঁতাকলে পড়ে কীভাবে গরিব মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে।

মানবিক মুখের অভাব ব্যাংকিং ব্যবস্থায়?

অর্থনীতিবিদ ও সমাজকর্মীদের একাংশের মতে, ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার এই অতিরিক্ত যান্ত্রিকীকরণ বা ‘ডিজিটাল এক্সক্লুশন’ (Digital Exclusion) প্রান্তিক মানুষকে সমাজ থেকে আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে। গ্রামীণ ব্যাঙ্কগুলিতে কর্মীদের একাংশের চরম উদাসীনতা এবং সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। যেখানে একজন মুমূর্ষু বৃদ্ধের বেঁচে থাকার জন্য জমানো টাকার প্রয়োজন, সেখানে নিয়মের দোহাই দিয়ে অ্যাকাউন্ট লক করে রাখা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে উঠছে বড়সড় প্রশ্ন।