সেই আয়ের প্রধান উৎস গালফ অঞ্চলের ভয়াবহ অস্থিরতা নির্বাচনী আলোচনায় প্রায় অদৃশ্য। রাজনৈতিক প্রচারের উত্তাপ বাড়লেও বাস্তব সংকট নিয়ে নীরবতা প্রশ্ন তুলছে।ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইজরায়েলের সংঘর্ষ ঘিরে পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা ক্রমশ তীব্র হয়েছে। গালফ অঞ্চলের আকাশপথ এখন কার্যত যুদ্ধক্ষেত্র— ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাল্টাপাল্টি ব্যবহারে বিমান চলাচল বিপর্যস্ত।
দুবাইয়ের বিমানবন্দর এলাকায় হামলা, বাহরাইনের রাজধানী মানামায় আবাসিক অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ার মতো ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বহু ভারতীয়, বিশেষ করে কেরলের শ্রমিক, নিরাপদে দেশে ফেরার জন্য বাধ্য হয়েছেন দীর্ঘ স্থলপথে সৌদি আরব হয়ে যাত্রা করতে।
গালফে বর্তমানে প্রায় ২২ লক্ষ কেরলবাসী কর্মরত। তাঁদের বড় অংশই নিম্ন ও মধ্য আয়ের শ্রমজীবী মানুষ। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে অনেকেই জানিয়েছেন, কাজ বন্ধ, অনিশ্চিত ছুটি, বেতন আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। বহু সংস্থা ইতিমধ্যেই সতর্ক করে দিয়েছে— সংকট চলাকালীন বেতন বিলম্বিত, কমানো বা স্থগিত হতে পারে। নতুন নিয়োগ প্রায় থমকে গিয়েছে, এমনকি সদ্য যোগ দেওয়া কর্মীদের চাকরিচ্যুতির ঘটনাও বাড়ছে। প্রবাসীদের একাংশ জানাচ্ছেন, তাঁরা নিজেদের আবাসন থেকেই ড্রোন হামলা প্রত্যক্ষ করছেন; সাইরেন ও নিরাপত্তা সতর্কতায় স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত।
তবুও রাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক জোট— লেফট ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট এবং ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট— এই সংকট নিয়ে কার্যত নীরব। কোনও সুস্পষ্ট নীতিগত অবস্থান বা রূপরেখা সামনে আসেনি। কেরলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখনও বিষয়টিকে কেন্দ্রীয় বিদেশনীতি হিসেবে দেখছে, যদিও এর সরাসরি অভিঘাত রাজ্যের অর্থনীতি ও সমাজে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল।
এই নীরবতার পিছনে রয়েছে ‘কুল্লু থামাম’— সব ঠিক আছে— এই আশ্বাসের বয়ান। গালফভিত্তিক কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও কেরলের একাংশের সংবাদমাধ্যম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে তুলে ধরছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হলেও বাস্তব সংকট— মজুরি অনিশ্চয়তা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, খাদ্য সরবরাহে বিঘ্ন— প্রায় আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। প্রবাসী পরিবারগুলির মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে, বিশেষ করে সন্তানের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে।
২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে কেরলে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ২৩.৪ বিলিয়ন ডলার, যা রাজ্যের জিডিপির ১৭.১ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অর্থনীতি নির্ভর করছে গালফে কর্মরত প্রবাসীদের উপার্জনের উপর। আবাসন, শিক্ষা, স্বর্ণবাজার থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ভোগ— সব ক্ষেত্রেই এই অর্থপ্রবাহের গভীর প্রভাব রয়েছে। আপাতত রেমিট্যান্স প্রবাহ অব্যাহত থাকায় সংকটের পূর্ণ অভিঘাত দৃশ্যমান নয়।
কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই স্থিতি যথেষ্ট ভঙ্গুর। যদি নির্মাণ প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়, ভিসা নবীকরণ থেমে যায়, নতুন নিয়োগ স্থগিত হয় এবং সংস্থাগুলি ‘ফোর্স মেজর’ ধারা প্রয়োগ শুরু করে, তবে তার অভিঘাত হঠাৎই কেরলে আছড়ে পড়বে। কর্মহীন প্রবাসীদের প্রত্যাবর্তন, রেমিট্যান্স হ্রাস এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে চাহিদা কমে যাওয়ার ফলে রাজ্যের আর্থিক কাঠামো চাপে পড়তে পারে।নির্বাচনের প্রাক্কালে এই সংকট উপেক্ষা করা কেবল রাজনৈতিক বিচ্যুতি নয়, বরং ভবিষ্যতের এক সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হিসেবেই দেখছেন।