আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে…
জোজরি একদিন ছিল সহজ পাঠের সেই টলটলে মরশুমি নদীটারই মতো। এখন রাজস্থানের যোধপুর (Jodhpur) জেলার ধাওয়া গ্রামে দাঁড়িয়ে ষাটোর্ধ্ব বুরারাম পটেল সেই নদীরই কালো, দুর্গন্ধময় জলের দিকে তাকিয়ে আছেন। মারোয়াড়ি ভাষায় তিনি বলছিলেন, জোজরির জন্য তাঁর বুক ফেটে যায়। এক সময় এই নদীই ছিল কয়েকশো গ্রামের প্রাণভোমরা। আজ সেই ৮৩ কিলোমিটার দীর্ঘ নদী দিল্লির নর্দমার চেয়েও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। বিগত দুই দশক ধরে যোধপুর, পালি ও বালোত্রার বস্ত্র কারখানা, ইস্পাত কারখানা ও টাইলস কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য অবাধে মিশেছে এই জলে। লুনিক এই ছোট্ট উপনদীটার দম বন্ধ হয়ে এসেছে ক্রমশ।
সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জোজরির একশো মিটারের মধ্যে সব নির্মাণকাজ এবং পাঁচশো মিটারের মধ্যে যে কোনও ধরনের দূষণসৃষ্টিকারী শিল্প নিষিদ্ধ করেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, নদীতে এক ফোঁটা পরিশোধিত বর্জ্য জলও (tertiary treated wastewater) ফেলা চলবে না। রাজস্থান সরকারকে একটি সমন্বয় কমিটি এবং নদী পুনরুজ্জীবন কর্তৃপক্ষ (River Rejuvenation Authority) গঠনের নির্দেশও দিয়েছে শীর্ষ আদালত। কিন্তু বাস্তবের ছবি বদলায়নি বিশেষ।
নদীর জল যখন বিষ
যোধপুর শহরের নিকাশি জল এবং বোরানাডা শিল্পাঞ্চলের কারখানার বর্জ্য মিশে জোজরির জল এমন দূষিত হয়ে পড়েছে যে নদীপাড়ের গ্রামগুলিতে বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে উঠেছে। দুই দশক ধরে জমে থাকা পলি ও বর্জ্যের চাপে নদীর পাড় ভেঙে পড়েছে বহু জায়গায়। দূষিত জল ঢুকে পড়ছে চাষজমিতে, জমি হয়ে পড়ছে অনুর্বর।
এলাকারই এক কৃষক বাবু খান জানালেন, সতেরো-আঠারো বছর আগেও এই এলাকায় জীবন ছিল সহজ, শান্তিপূর্ণ। বাজরা, মুগ, জোয়ারের ভালো ফলন হত। এখন জমি সব বন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। এ বছরও তাঁর বাজরার ফসল নষ্ট হয়েছে। গবাদি পশুও এই দূষিত জল খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। মোদ্দা কথা চাষের জমি তো বটেই দূষিত জলের পাশে চরে বেড়ানো গোরু, হরিণ, নীলগাইয়ের মতো বন্যপ্রাণীও সমান ভাবে বিপন্ন।
গ্রামবাসীদের আক্ষেপ, এই দূষিত জল খাওয়া গোরুর দুধ ও ঘি খেয়ে তাঁদের সন্তানরাও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। গাঁটে গাঁটে ব্যথার মতো দুরারোগ্য অসুখ ঘরে ঘরে। ডেঙ্গি ও ম্যালেরিয়ার প্রকোপও বেড়েছে বহুগুণ।
বন্ধ্যা জমির কান্না
বুরারাম পটেলের ক্ষোভ যেন থামতেই চায় না। তাঁর কথায়, প্রায় দুই দশক ধরে মশারি ছাড়া রাতে ঘুমোতে পারেন না গ্রামবাসীরা। বিশ বছর আগেও নদী ছিল স্বচ্ছ। তার পর যোধপুর শহরের অপরিশোধিত নিকাশি জল আর শিল্প বর্জ্য মিশতে শুরু করে নদীতে। জল হয়ে ওঠে বিষাক্ত। তাঁর নাতি জন্মের পর থেকে কখনও নদীকে পরিষ্কার অবস্থায় দেখেইনি।
ধাওয়া গ্রামের প্রাক্তন সরপঞ্চ মদন লাল পটেল বলছেন, ২০০০ সাল নাগাদ প্রথম জোজরির জল চাষজমিতে ঢুকতে শুরু করে। তখন নদীতে মূলত যোধপুর শহরের নিকাশি জলই আসত, শিল্পবর্জ্য তেমন ছিল না বলে ক্ষতি ছিল সীমিত। কিন্তু বোরানাডায় শিল্পায়ন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। রাজস্থানের রাজ্যপুষ্প রোহিড়া (Rohida) গাছও এই দূষণের জেরে প্রায় বিলুপ্তির পথে বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, গুজরাতের সবরমতী নদীর ধাঁচে জল শোধনের পরিকাঠামো তৈরি না হলে জোজরিকে বাঁচানো সম্ভব নয়।
ঘরে ঢুকল বিষজল
ধাওয়া লাগোয়া একটি বসতিতে এক মায়ের কথায় স্পষ্ট হয় সংকটের গভীরতা। কয়েক বছর আগে দূষিত জল ঢুকে ডুবিয়ে দেয় তাঁদের ঘরবাড়ি ও জমি, বাধ্য হয়ে অন্যত্র সরে যেতে হয় পরিবারকে। নতুন ঘর তৈরি হলেও এখন সংসার চলে একজনের রোজগারে, চাষের জমি থেকে আর কিছু আসে না।
স্থানীয় বাসিন্দা রমেশের কথায়, বৃষ্টি এলেই গোটা বসতি ডুবে যায় দূষিত জলে। সরকার ফসলের ক্ষতিপূরণ বাবদ যে সামান্য অর্থ দিয়েছিল, তা-ও এ বছর মেলেনি এখনও। হাজার হাজার বিঘা কৃষিজমি অনুর্বর হয়ে পড়েছে অথচ শিল্প ও নিকাশি বর্জ্য বন্ধ করতে সরকার ব্যর্থ। ক্ষোভ ঝরে পড়ছে তাঁর গলায়।
রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব
স্থানীয় পরিবেশ কর্মী শ্রাবণ পটেল প্রশ্ন তুলেছেন আগের ক্ষমতাসীন সরকারগুলির রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়েও। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলট এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াতের নিজস্ব জেলা হওয়া সত্ত্বেও ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে ঘোষিত ১৭২ কোটি টাকার রিভারফ্রন্ট প্রকল্পের একটি ইটও এখনও গাঁথা হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ। সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপের পর গত ছয়-সাত মাসে বেশ কিছু বেআইনি কারখানা বন্ধ হলেও মূল সমস্যা, অর্থাৎ শিল্প ও নিকাশি বর্জ্যের যথাযথ পরিশোধন, এখনও অধরা।
শেষ সতর্কতা
জোজরির এই পরিণতি আসলে শুধু রাজস্থানের গল্প নয়। দামোদর কিংবা চূর্ণীর মতো পশ্চিমবঙ্গের একাধিক নদীও শিল্প বর্জ্য ও অপরিশোধিত নিকাশি জলের চাপে ধুঁকছে বহু বছর ধরে। জোজরির অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, সময় থাকতে ব্যবস্থা না নিলে নদীর মৃত্যু আসলে কেড়ে নেয় গোটা একটা জনপদের জীবনযাত্রা, চাষবাস, স্বাস্থ্য, সবকিছু। তাই ঘুরে দাঁড়ানোই সময়ের দাবি।