ঝাড়খণ্ডে ফের রাজনৈতিক উত্তাপ। রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে এবার সরাসরি চরমসীমা বেঁধে দিল বিজেপি (BJP)। জেপিএসসি (JPSC) ও জেএসএসসি (JSSC) পরিচালিত একাধিক নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে সিবিআই (CBI) তদন্তের দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে গেরুয়া শিবির। এই সময়ের মধ্যে দাবি মানা না হলে আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
স্মারকলিপি জমা
বুধবার রাজ্য বিজেপি সভাপতি আদিত্য সাহু এবং বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা বাবুলাল মারান্ডির নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল প্রোজেক্ট ভবনে গিয়ে দেখা করে রাজ্যের মুখ্যসচিব অবিনাশ কুমারের সঙ্গে। সেখানেই দলের তরফে একটি স্মারকলিপি তুলে দেওয়া হয় প্রশাসনের হাতে।
বিজেপির মূল দাবি দুটি। প্রথমত, বাতিল বা স্থগিত হওয়া জেপিএসসি ও জেএসএসসি পরিচালিত পরীক্ষাগুলিতে অনিয়মের ঘটনায় সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও গভীরে গিয়ে তদন্ত চালানোর জন্য মামলাটি সিবিআইয়ের হাতে তুলে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরীক্ষা সংক্রান্ত বিক্ষোভের সময় ও পরে ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সব এফআইআর (FIR) অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।
‘সুপ্রিম’ রায়ের পরই
এই ঘটনাক্রমকে বিচ্ছিন্ন কোনও রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর ঠিক একদিন আগেই সুপ্রিম কোর্ট CJP-র বিক্ষোভকারীদের বড়সড় স্বস্তি দিয়েছে। জুলাইয়ের ২০ থেকে ২৫ তারিখের মধ্যে হওয়া আন্দোলন ঘিরে বিভিন্ন রাজ্যে দায়ের হওয়া এফআইআর কার্যকর করা যাবে না বলে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত। সেই মামলাগুলি কার্যত বন্ধ বা খারিজ বলে গণ্য হবে।
শীর্ষ আদালতের এই রায়কেই এখন ঝাড়খণ্ডে হাতিয়ার করছে বিজেপি। ছাত্রছাত্রীদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রশাসনের উপর নৈতিক চাপ তৈরির কৌশল স্পষ্ট। দলের বক্তব্য, ছাত্ররা শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পথে প্রায় এক মাস ধরে আন্দোলন চালিয়েছিল। তার পরও একাধিক থানায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়েছে, যা প্রত্যাহার হওয়া উচিত।
আন্দোলনের রেশ
জেপিএসসি-জেএসএসসি বিতর্ক ঝাড়খণ্ডে নতুন কিছু নয়। জেএসএসসি সিজিএল (JSSC-CGL) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও একাধিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে আগেও রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভ হয়েছে। গত মাসেই বিধানসভা ঘেরাওয়ের চেষ্টার সময় পুলিশের সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের খণ্ডযুদ্ধ, কাঁদানে গ্যাস আর লাঠিচার্জের ঘটনাও ঘটে। সেই সময় আদিত্য সাহু, বাবুলাল মারান্ডি-সহ বিজেপির সব বিধায়ককে আটক করা হয়েছিল।
জেএমএম (JMM) নেতৃত্বাধীন হেমন্ত সোরেন সরকার ইতিমধ্যে ২২টি নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল এবং আরও ২৩টি পরীক্ষায় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। রাজ্য সরকারের যুক্তি, নিজস্ব তদন্তকারী সংস্থাই বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। কিন্তু বিজেপির দাবি, সিবিআইয়ের মতো স্বাধীন সংস্থা ছাড়া প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করা সম্ভব নয়।
পুরনো অভিজ্ঞতা
নিয়োগ দুর্নীতি ঘিরে এমন আন্দোলন আর সিবিআই তদন্তের দাবি পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের কাছে একেবারেই অচেনা নয়। রাজ্যের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগ দুর্নীতি মামলা বছরের পর বছর ধরে রাজনীতির কেন্দ্রে থেকেছে। সেই ইস্যুই শেষমেশ রাজ্যে ক্ষমতা পরিবর্তনের অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে ক্ষমতায় আসার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে জিরো টলারেন্স (zero tolerance) নীতি ঘোষণা করেছে। ঝাড়খণ্ডের ঘটনাপ্রবাহ তাই আসলে গোটা দেশের সামনে একটি প্রশ্ন তুলে ধরছে। নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও তদন্তের গতি নিয়ে যে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে, তা কি শুধু একটি রাজ্যের সমস্যা, নাকি গোটা দেশের প্রশাসনিক কাঠামোরই দুর্বলতা?