মহাকাশ গবেষণায় বেসরকারিকরণের পথে বড় পদক্ষেপ করতে চলেছে কেন্দ্র। তামিলনাড়ুর তুতিকোরিন জেলার কুলশেকরপত্তনমে (Kulasekarapattinam) নির্মীয়মাণ ইসরোর (ISRO) দ্বিতীয় স্পেসপোর্ট বা রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের পরিচালনভার এবার তুলে দেওয়া হবে বেসরকারি সংস্থার হাতে। প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা খরচে তৈরি হওয়া এই কেন্দ্রটির সম্পূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য ইতিমধ্যেই ভারতীয় বেসরকারি সংস্থাগুলির কাছে আবেদন আহ্বান করেছে ইন-স্পেস (IN-SPACe), অর্থাৎ ভারতীয় জাতীয় মহাকাশ উন্নয়ন ও অনুমোদন কেন্দ্র।
২২৩৩ একর জমির উপর গড়ে ওঠা এই স্পেসপোর্ট মূলত ছোট উপগ্রহ উৎক্ষেপণের জন্য তৈরি করা হচ্ছে। এখান থেকে উৎক্ষেপণ করা হবে স্মল স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল বা এসএসএলভি (SSLV), যা ৫০০ কিলোগ্রামের কম ওজনের উপগ্রহ মহাকাশে পাঠাতে সক্ষম। শ্রীহরিকোটার তুলনায় এই কেন্দ্র থেকে সরাসরি দক্ষিণমুখী কক্ষপথে উৎক্ষেপণ সম্ভব হবে, যার ফলে জ্বালানি সাশ্রয়ও হবে অনেকটাই। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই কেন্দ্রের শিলান্যাস করেছিলেন। চলতি অর্থবর্ষের মধ্যেই কেন্দ্রটি সম্পূর্ণ চালু হয়ে যাওয়ার কথা।
তবে এই বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রশ্নও উঠছে নানা মহলে। ইসরোর মতো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার তৈরি পরিকাঠামো পুরোপুরি বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত অনেকেরই মত, ইসরোর নিজস্ব পরিচালনাতেই কেন্দ্রটি থাকা উচিত ছিল। যদিও কেন্দ্রের যুক্তি, আমেরিকার মতো দেশেও সরকারি মহাকাশ বন্দরগুলিকে পরিচালনার ভার বেসরকারি সংস্থাকে দেওয়া হয়, তাতে কোনও ক্ষতি নেই। আবেদনকারী সংস্থার জন্য শর্তও কড়া রাখা হয়েছে। আবেদনকারী সংস্থার অন্তত সাত বছরের উৎক্ষেপণ অভিজ্ঞতা, ২০০০ কোটি টাকার বার্ষিক টার্নওভার এবং হাজার কোটি টাকার মূলধনী সম্পদ থাকা আবশ্যিক। এই আবশ্যিক শর্তগুলি পূরণ করছে হায়দরাবাদের স্কাইরুট অ্যারোস্পেস (Skyroot Aerospace)। যারা সম্প্রতি মহাকাশে বিক্রম-১ উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করেছে। মনে করা হচ্ছে, কেন্দ্রের গুড বুকে থাকা এই সংস্থাই সম্ভবত মহাকাশ বন্দরটি পরিচালনার বরাত পেতে চলেছে।
মহাকাশ শিল্পে বেসরকারি লগ্নির এই উদ্যোগ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। কেন্দ্র ইতিমধ্যেই মহাকাশ খাতে ১০০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআইয়ের (FDI) অনুমতি দিয়েছে। পাশাপাশি স্টার্টআপ সংস্থাগুলির জন্য এক হাজার কোটি টাকার অন্তরীক্ষ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল তহবিলও গঠন করা হয়েছে। রাজ্যের তথ্যপ্রযুক্তি ও ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষায় দক্ষ যুবসমাজের কাছে তাই মহাকাশক্ষেত্র নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। খড়্গপুর আইআইটি-সহ (IIT Kharagpur) রাজ্যের একাধিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছর যে বিপুল সংখ্যক দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার বেরোচ্ছেন, তাঁদের জন্য মহাকাশ প্রযুক্তি শিল্পে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়লে নতুন দিগন্ত খুলে যেতে পারে। যদিও রাজ্যে সরাসরি কোনও মহাকাশ পরিকাঠামো প্রকল্প এখনও ঘোষিত হয়নি, তবে দেশজুড়ে এই খাতের সম্প্রসারণ পরোক্ষভাবে বাংলার প্রযুক্তি অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।