ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া বা এসআইআর ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করল রাজধানীতে। মঙ্গলবার দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠক করে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরাসরি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুললেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। এর নেপথ্যে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের স্বার্থ।
এদিন সাংবাদিক বৈঠকের শুরু থেকেই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র আক্রমণ শানান মমতা। তাঁর বক্তব্য, ‘এআই দিয়ে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। মানুষ জানতেই পারছে না, কী ভাবে তার ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।’ একই সঙ্গে তিনি কটাক্ষ করে বলেন, ‘দিল্লির সংবাদমাধ্যম তো জানবেই না বাংলায় কী হচ্ছে।’
প্রসঙ্গত, এসআইআরকে কেন্দ্র করে বিরোধী শিবিরের ক্ষোভ এখন সংসদ পর্যন্ত গড়িয়েছে। সূত্রের খবর, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনার প্রস্তুতি শুরু করেছে বিরোধীরা। লোকসভার পাশাপাশি রাজ্যসভাতেও এই প্রস্তাব উত্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস ইতিমধ্যেই কংগ্রেস-সহ অন্যান্য বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে।
মমতার অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রহসনে পরিণত করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, ‘ভবানীপুরে ৪০ হাজার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। বিজেপির কেন্দ্রে কম নাম বাদ যাচ্ছে। কিন্তু তৃণমূলের কেন্দ্রে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।’ তাঁর আরও বক্তব্য, ‘মানুষ ভোট দিয়ে ঠিক করে কে শাসক হবে। এখন বিজেপি ঠিক করছে, কে ভোটার হবে।’
সাংবাদিক বৈঠকে আরও বিস্ফোরক অভিযোগ করেন মমতা। তাঁর দাবি, নির্বাচন কমিশনের কাজে বিজেপির কর্মীদের যুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সীমা খন্না নামে একজন বিজেপি কর্মী এআই ব্যবহার করে নাম বাদ দিচ্ছেন। কমিশন তাঁকে দিয়ে কাজ করাচ্ছে।’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘অমর্ত্য সেন, জয় গোস্বামীর মতো ব্যক্তিত্বদেরও এসআইআর নোটিস পাঠানো হয়েছে। ভাবা যায়!’
দিল্লিতে থাকাকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রসঙ্গে সরাসরি সমর্থন জানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘আমি চাই ইমপিচমেন্ট হোক। আমাদের সংখ্যা নেই, সেটা ঠিক। কিন্তু সংবিধানে সেই প্রভিশন আছে। অন্তত রেকর্ডে থাকবে। আমরা জনস্বার্থে একজোট হয়ে কাজ করছি।’
তবে বিরোধীদের এই উদ্যোগকে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। তাঁর মন্তব্য, ‘ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব যে কেউ আনতে পারে। কিন্তু সংখ্যা কোথায়? দেশের মানুষ আপনাদের বেছে নেয়নি।’ এসআইআরে ‘ক্ষতিগ্রস্ত’দের নিয়ে চাণক্যপুরীর নতুন বঙ্গভবনে সাংবাদিক বৈঠক করেন মমতা। বৈঠকের শেষে রাজধানীর সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আবার দেখা হবে জেতার পরে। তখন ভাল মিষ্টি খাওয়াব। তবে দিল্লির লাড্ডু নয়।’
বিধানসভা নির্বাচনে আসনসংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মমতা বলেন, ‘আমি রাজনৈতিক জ্যোতিষী নই। তবে আরও বেশি আসন নিয়ে জিতব।’ তাঁর পাশেই ছিলেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনিও বলেন, ‘আমরা এসআইআরের বিরোধী নই। কিন্তু এই অপরিকল্পিত এসআইআর মেনে নেওয়া যায় না।’
কংগ্রেসের সঙ্গে জোট প্রসঙ্গে এদিন মমতার সাফ কথা, ‘পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল একাই লড়বে।’ এসআইআর নিয়ে ভবিষ্যৎ রণকৌশল সম্পর্কে তিনি জানান, ‘মাঠ ছাড়ব না। এক ইঞ্চি জমিও ছাড়ব না।’ এসআইআর ঘিরে বাংলার রাজনীতিতে যে লড়াই আরও তীব্র হতে চলেছে, তা এ দিনের সাংবাদিক বৈঠকেই স্পষ্ট করে দিলেন তৃণমূলনেত্রী।