গাড়োয়াল হিমালয়ের কোলে ৭,১৩০ মিটার উঁচু এক চূড়া। নাম তার মাউন্ট মুকুট ইস্ট (Mt. Mukut East)। সেই দুর্গম শৃঙ্গ ছুঁতেই এবার পা বাড়াল ইন্ডিয়ান কোস্ট গার্ডের (Indian Coast Guard) পর্বতারোহী দল। লক্ষ্য শুধু একটি চূড়া জয় নয়, বরং ২০২৭ সালে কোস্ট গার্ডের সুবর্ণ জয়ন্তীতে (Golden Jubilee) মাউন্ট এভারেস্ট (Mount Everest) অভিযানের আগে নিজেদের যাচাই করে নেওয়া। আর এই গোটা উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছে দার্জিলিংয়ের হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট (Himalayan Mountaineering Institute, HMI)।
আচার্য বালকৃষ্ণর আশীর্বাদ
হরিদ্বার থেকে কোস্ট গার্ডের বিশেষ দল রওনা হওয়ার আগে পতঞ্জলি যোগপীঠে (Patanjali Yogpeeth) এক বিশেষ আয়োজন করা হয়। সেই উপলক্ষে যোগপীঠের মহাসচিব আচার্য বালকৃষ্ণর (Acharya Balkrishna) উপস্থিতিতে এক অনন্য মুহূর্ত তৈরি হয়। তিনি পর্বতারোহী দলকে আশীর্বাদ জানিয়ে দুর্গম অভিযানের উদ্দেশে রওনা করান। আচার্য বালকৃষ্ণর কথায়, এই অভিযান ইন্ডিয়ান কোস্ট গার্ডের সাহস, শৃঙ্খলা আর রাষ্ট্রসেবার মানসিকতার প্রতিফলন। তাঁর অভিমত, ভারতের এমন প্রত্যয়ী ও একনিষ্ঠ বাহিনীই দেশবাসীকে নিরাপদে রাখে। তাঁর বিশ্বাস, দলটি সফল হয়েই ফিরবে এবং নতুন উদ্যমে দেশের কাজে লাগবে।
কেন মাউন্ট মুকুট ইস্ট
কামেট (Kamet) পর্বতমালার কাছে জাসকর রেঞ্জে (Zaskar Range) অবস্থিত মুকুট পর্বতের দু’টি শৃঙ্গ। পর্বতটির মূল চূড়া ৭,২৪২ মিটার আর পূর্ব চূড়া অর্থাৎ মুকুট ইস্ট ৭,১৩০ মিটার উঁচু। ১৯৯৯ সালে নেহরু ইনস্টিটিউট অফ মাউন্টেনিয়ারিংয়ের একটি দল প্রথম এই পূর্ব শৃঙ্গ জয় করেছিল। তার আগে পর্যন্ত এই চূড়ায় কোনও কোস্ট গার্ডের প্রতিনিধি পা রাখেননি। সেই কারণেই এই অভিযানকে কোস্ট গার্ডের প্রথম প্রচেষ্টা বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। দলের লক্ষ্য এই দুর্গম শৃঙ্গে ভারতের তেরঙা উত্তোলন।
দার্জিলিংয়ের HMI
এই অভিযান একা কোস্ট গার্ডের নয়। অভিযাত্রীদের সঙ্গী দার্জিলিংয়ে অবস্থিত হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটও। ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা দেশের অন্যতম পুরনো ও বিখ্যাত পর্বত আরোহণ প্রশিক্ষণকেন্দ্র। সাম্প্রতিক সময়ে ইন্ডিয়ান কোস্ট গার্ড বা তটরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে HMI-এর সহযোগিতা ক্রমশ জোরালো হয়েছে। চলতি বছরের মার্চে এভারেস্ট অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে প্রবল তুষারঝড়ের মধ্যে কোস্ট গার্ডের প্রতিনিধিরা মাউন্ট বিসি রায় (Mount BC Roy) শৃঙ্গে সফলভাবে অভিযান করেছিলেন, সেই ধারাবাহিকতারই সাম্প্রতিক সংযোজন এবার মুকুট ইস্ট।
HMI-এর অধ্যক্ষ কর্নেল রজনীশ জোশীর বক্তব্য, হিমালয়ের উচ্চতায় প্রতিটি পদক্ষেপ শক্তির প্রতীক, প্রতিটি সিদ্ধান্ত বিচক্ষণতার পরিচায়ক। আচার্য বালকৃষ্ণর আশীর্বাদ নিয়ে অভিযান শুরু হওয়াকে তিনি সৌভাগ্যের বলে বর্ণনা করেছেন।
২০২৭ সালে সুবর্ণ জয়ন্তী
১৯৭৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান কোস্ট গার্ড ২০২৭ সালে পূর্ণ করবে পঞ্চাশ বছর। সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন স্মরণীয় করে রাখতে বাহিনীর পরিকল্পনা মাউন্ট এভারেস্ট অভিযান। তার আগে ধাপে ধাপে কঠিন থেকে কঠিনতর শৃঙ্গে দলের সদস্যদের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। দলের সিনিয়র আধিকারিক কম্যান্ডান্ট বিশ্বজিতের কথায়, প্রতিকূল আবহাওয়া, দুর্গম ভূখণ্ড এবং প্রবল উচ্চতার চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও দলের সদস্যরা প্রশিক্ষণ, টিমওয়র্ক আর দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি নিয়ে অভিযান সফল করতে বদ্ধপরিকর।
আচার্য বালকৃষ্ণও জানিয়েছেন, এই মহতী উদ্যোগে পাশে দাঁড়ানোই পতঞ্জলির লক্ষ্য। তাঁর মতে, ইন্ডিয়ান কোস্ট গার্ড আর HMI-এর এই যৌথ উদ্যোগ শুধু পর্বতারোহণের ঐতিহ্য এগিয়ে নিয়ে যাবে না, তরুণ প্রজন্মকেও প্রকৃতির পাঠ দেবে। পাশাপাশি শৃঙ্খলা, সাহস আর রাষ্ট্রসেবায় অনুপ্রাণিত করবে।