পহেলগাম ঘটনার পর সিন্ধুচুক্তি স্থগিত করেছিল ভারত। এবার ইরাবতীর অতিরিক্ত জল বন্ধ করতে চলেছে ভারত। পাকিস্তানকে ইরাবতীর অতিরিক্ত জল দেবে না ভারত। ৩১ মার্চের মধ্যেই শাহপুর কান্দি বাঁধের কাজ শেষ হচ্ছে বলে খবর। আর বাঁধটি তৈরি হচ্ছে জম্মু ও কাশ্মীর এবং পাঞ্জাবের সীমান্ত এলাকায়।
বাঁধটি তৈরি হয়ে গেলেই ইরাবতীর অতিরিক্ত জল পাকিস্তানে পাঠানো বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে জানা গিয়েছে। জম্মু-কাশ্মীরের জল সম্পদমন্ত্রী জাভেদ আহমেদ রানা জানিয়েছেন, ‘ইরাবতী নদীর অতিরিক্ত জল পাকিস্তানকে দেওয়া হবে না। এটা বন্ধ করতেই হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কাঠুয়া এবং সাম্বা জেলা খরা অধ্যুষিত। এই প্রকল্পটি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এটা তৈরি হবে কান্দি এলাকাতেই।’
ইরাবতী নদীর জল আরও বেশি করে কাজে লাগাতেই এই প্রকল্পের উপর বেশি করে জোর দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগেই এই প্রকল্পের কাজ পর্যলোচনা শুরু হয়। পহেলগাম হামলার পরেই জম্মু ও কাশ্মীরে চন্দ্রভাগা নদীর উপরে যে প্রকল্প তৈরি হচ্ছিল, তা দ্রুততার সঙ্গে শেষ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। চন্দ্রভাগা নদীর উপরে চারটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ চলেছে। ২০২৭-২৮ সালের মধ্যেই ওই প্রকল্প চালু হয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সিন্ধুচুক্তি অনুযায়ী, চন্দ্রভাগার জল ব্যবহার করতে পারবে পাকিস্তান। তবে গত বছর জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগামে সন্ত্রাসবাদী হামলা চালানো হয়। ২৫ জন পর্যটক-সহ একজন স্থানীয় বাসিন্দা নিহত হয়। এর পর পরেই অপারেশন সিঁদুর চালায় ভারত। পাক অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীর এবং পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি জঙ্গি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেয় ভারত। সেই সঙ্গে স্থগিত করা হয় সিন্ধুজল চুক্তি। ১৯৬০ সালে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধুজল চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সিন্ধু ও তার উপনদীগুলির পূর্বমুখী শতদ্রু, বিপাশা এবং ইরাবতীর জল ভারতের প্রাপ্য। আর পশ্চিমমুখী সিন্ধু, চন্দ্রভাগা এবং বিতস্তার জল পাকিস্তান পাবে।
২০১৮ সালের ৬ ডিসেম্বর শাহপুর কান্দি বাঁধ প্রকল্পের অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা। ৪৮৫.৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। বাঁধটি তৈরি হলে পাঞ্জাবে ৫ হাজার হেক্টর এবং জম্মু ও কাশ্মীরে ৩২ হাজার ১৭৩ হেক্টর জমিতে সেচের সুবিধা পাবে। প্রকল্প কার্যকর করতে সহায়তা করবে পাঞ্জাব সরকারও। বাঁধ তৈরি হলে তারা ২০৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এমনিতে মাধোপুর নালার মাধ্যমে ইরাবতীর অতিরিক্ত জল পাকিস্তানে প্রবাহিত হয়।
১৯৭৯ সালে পাঞ্জাব এবং জম্মু ও কাশ্মীরের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী, শাহপুর কান্দি বাঁধ এবং রঞ্জিত সাগর বাঁধ নির্মাণের দায়িত্ব ছিল পাঞ্জাবের। যদিও প্রকল্পটির শিলান্যাস ১৯৯৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিংহ রাও করেছিলেন।
২০০১ সালে কমিশনের অনুমোদন মেলে এবং ২০০৯ সালে কেন্দ্রীয় সরকার অর্থ বরাদ্দে সম্মতি জানায়। পাঞ্জাব সরকারের আর্থিক অংশীদারিত্ব নিয়ে জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজ থমকে যায়। পাশাপাশি পঞ্জাব ও জম্মু-কাশ্মীর সরকারের মধ্যে কিছু প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত মতভেদও দেখা দেয়। ফলে প্রকল্পটির কাজ শুরু করতে দেরি হয়।
২০০৮ সালে কেন্দ্রীয় জলসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক এটিকে জাতীয় প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করে। পরে কেন্দ্রীয় সরকার, পাঞ্জাব এবং জম্মু-কাশ্মীর সরকারের মধ্যে একাধিক দফায় বৈঠক হয়। অবশেষে ২০১৮ সালে দুই রাজ্যের মধ্যে সমঝোতা মাধ্যমে বহুদিনের অচলাবস্থা কাটানো সম্ভব হয়।
এই প্রকল্প বাস্তবায়িত না হওয়ায় প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইরাবতী (রাভি) খালকে সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। ফলে সেচ ও জলসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য সুবিধা দীর্ঘদিন অধরাই ছিল। কূটনৈতিক মহলে এই সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ জলবণ্টন প্রশ্নটি ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের একটি সংবেদনশীল ইস্যু।