রাষ্ট্রসঙ্ঘে পাকিস্তানকে ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন রাষ্ট্র’ বলে দাবি ভারতের, সন্ত্রাসবাদ ও পিওকে ইস্যুতে তীব্র আক্রমণ

আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তানকে আবার কড়া ভাষায় অক্রমণ করল ভারত। রাষ্ট্রসঙ্ঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের অধিবেশনে পাকিস্তানকে সরাসরি ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন রাষ্ট্র’ বলে উল্লেখ করেছে দিল্লি। দিল্লির অভিযোগ, সন্ত্রাসবাদকে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবে ব্যবহার করার ফল এখন ইসলামাবাদকেই ভুগতে হচ্ছে।

রাষ্ট্রসঙ্ঘে ভারতের স্থায়ী মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি অনুপমা সিং বলেন, ‘পাকিস্তান বছরের পর বছর ধরে জঙ্গি সংগঠনগুলিকে আশ্রয় দিয়েছে। প্রশিক্ষণ ও মদতও দিয়েছে।’ অনুপমা সিং এই পরিস্থিতিকে একটি অদ্ভুত প্যারাডক্স হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এটি এমন একটি দেশ যেখানে খোদ প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিজেই রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে সন্ত্রাসবাদীদের আশ্রয় দেওয়া, প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং তাদের মোতায়েন করার কথা বুক বাজিয়ে স্বীকার করেন। অথচ আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে সেই পাকিস্তানই আবার নিজেকে সন্ত্রাসবাদের শিকার বলে দাবি করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই শক্তিগুলিই এখন পাকিস্তানের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ তাঁর কথায়, ‘নিজের তৈরি দানব যখন ফিরে এসে কামড়ায়, তখন অবাক হওয়ার কিছু নেই।’ ফ্রাঙ্কেনস্টাইন রাষ্ট্র বলতে তিনি এমন একটি রাষ্ট্রকে বোঝাতে চেয়েছেন যা নিজেই এমন শক্তি তৈরি করেছে, যা পরে তার নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে।


প্রসঙ্গত, নির্দিষ্ট কারও নাম না করে অনুপমা গত বছর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফের দেওয়া একটি বিস্ফোরক বিবৃতির দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে খোয়াজা আসিফ প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন, পাকিস্তান তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনকে মদত দেওয়া, তহবিল এবং প্রশিক্ষণ জোগানোর মতো ‘নোংরা কাজ’ করেছে। আর এর জন্য পরবর্তীতে দেশকে চড়া মূল্য চোকাতে হয়েছে।

পাকিস্তানের প্রতিনিধি রাষ্ট্রসঙ্ঘে জম্মু-কাশ্মীর প্রসঙ্গ তোলার পরই পাল্টা জবাব দেন অনুপমা। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘জম্মু-কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।’ তাঁর মতে, একমাত্র অমীমাংসিত বিষয় হল পাকিস্তানের দখলে থাকা ভারতীয় ভূখণ্ড অর্থাৎ পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর বা পিওকে। ভারতের প্রতিনিধি পিওকে-র বর্তমান পরিস্থিতিও তুলে ধরেন।

সম্প্রতি রাওয়ালকোট-সহ বিভিন্ন এলাকায় মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুতের বিলের চাপ, অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, তাঁদের ন্যায্য দাবির জবাব না দিয়ে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী দমন-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে বহু সাধারণ মানুষের হতাহত হওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।

অনুপমা সিং বলেন, ‘রাওয়ালকোটে সাধারণ মানুষের উপর দমন-পীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমিয়ে রাখার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’ তাঁর অভিযোগ, আন্তর্জাতিক মঞ্চে মানবাধিকারের কথা বললেও পাকিস্তান নিজের দেশের সমস্যাগুলি নিয়ে নীরব। ভারতের দাবি, সন্ত্রাসবাদকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার নীতির ফলেই পাকিস্তান আজ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সঙ্কটের মুখে। পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রেও পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে দিল্লি।

উল্লেখ্য, অনুপমা সিং ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রকের একজন উচ্চপদস্থ কূটনীতিক। বর্তমানে তিনি রাষ্ট্রসঙ্ঘে ভারতের স্থায়ী মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি বা প্রথম সচিব হিসেবে কর্মরত। বিশ্বমঞ্চে ভারতের বিদেশ নীতিকে দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরাই তাঁর মূল কাজ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের বিরুদ্ধে চলা শত্রুভাবাপন্ন ভূ-রাজনৈতিক প্রচারের কড়া ও যথোপযুক্ত জবাবও দিয়ে থাকেন তিনি।