SIR ইস্যুতে ফের সুপ্রিম দরজায় ইন্ডি জোট: প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো চিঠিতে চমক, সই আপ-ডিএমকেরও

X / @ElectionTracke7 (প্রতীকী ছবি)

সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়ে দিয়েছিল গত মে মাসেই। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তর (Surya Kant) নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়েছিল, নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (Special Intensive Revision, SIR) সম্পূর্ণ সংবিধানসম্মত। তার পরেও ঠিক এক মাসের মাথায়, মঙ্গলবার,  তেইশটি রাজনৈতিক দল এবং একজন নির্দল সাংসদের তরফে চিঠি গেল প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের কাছে।

জাতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ (Jairam Ramesh) এক্স হ্যান্ডলে জানান, ২৩টি রাজনৈতিক দল এবং নির্দল রাজ্যসভা সদস্য কপিল সিব্বল (Kapil Sibal) যৌথ ভাবে চিঠি পাঠিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে। বিষয়, এসআইআর প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা। তাঁর কথায়, গত ৮ জুন ইন্ডি জোটের (I.N.D.I.A Bloc) বৈঠকেই এই চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু এখানেই লুকিয়ে রাজনৈতিক চমক। ৮ জুনের সেই বৈঠকে আম আদমি পার্টি (AAP) এবং ডিএমকে (DMK) ছিল না। অথচ মঙ্গলবারের চিঠিতে দুই দলই সই করেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে ডেরেক ও’ব্রায়েন (Derek O’Brien) নিজেই এক্স-এ লিখেছেন, আপ এবং ডিএমকে দুই দলই চিঠিতে সই করেছে। রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা, বৈঠক এড়িয়ে গেলেও এসআইআর প্রশ্নে বিরোধী জোটের সঙ্গে দূরত্ব রাখতে রাজি নয় কোনও দলই। জয়রাম রমেশ পুরো উদ্যোগটিকে বেঁধেছেন একটি সংক্ষিপ্ত নামে। সিওর (SURE), অর্থাৎ সলিডারিটি, ইউনিটি অ্যান্ড রেজিস্ট্যান্স।


প্রশ্ন হল, সুপ্রিম কোর্ট আগেই তো রায়দান করেছে। তাহলে ফের চিঠি কেন?

উত্তর লুকিয়ে আছে এসআইআর সংক্রান্ত ক্রবর্ধমান বিতর্কে। গত বছর জুনে বিহার দিয়ে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়া এখন গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিহারে প্রায় সাতচল্লিশ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছিল বলে রিপোর্ট। তারপর পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ-সহ একাধিক রাজ্যে দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়। পশ্চিমবঙ্গে প্রায় একানব্বই লক্ষ এবং উত্তরপ্রদেশে প্রায় দুই কোটি চার লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে বলে কমিশন সূত্রের দাবি। তৃতীয় পর্বে হিমাচল প্রদেশ, জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখ বাদ দিয়ে গোটা দেশ এই প্রক্রিয়ার আওতায় আসছে।

পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষিতে এই বিতর্ক বিশেষ ভাবে স্পর্শকাতর। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে আদতে অসমের ধাঁচে নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি (NRC) ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে, এই আশঙ্কা থেকেই সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে একাধিক অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর সামনে এসেছিল গত বছর। তৃণমূল কংগ্রেস শুরু থেকেই এই প্রক্রিয়াকে বিজেপির অনুকূলে কমিশনের পক্ষপাতিত্ব বলে তোপ দেগেছে। কংগ্রেস, সিপিএম, সমাজবাদী পার্টি, আরজেডি সহ একাধিক দলেরও একই অভিযোগ।

কমিশনের যুক্তি অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। দ্রুত নগরায়ণ, ক্রমাগত পরিযায়ী শ্রমিক ও পরিবারের সংখ্যাবৃদ্ধি, নতুন ভোটারের সংযোজন এবং মৃত ভোটারদের নাম দীর্ঘদিন তালিকায় থেকে যাওয়া, এই কারণেই এত বড় সংশোধন প্রয়োজন বলে কমিশনের দাবি। আদালতেও কমিশনের তরফে সওয়াল করা হয়েছিল, প্রতিনিধিত্ব আইনের (Representation of the People Act) একুশ নম্বর ধারা এবং সংবিধানের তিনশো চব্বিশতম অনুচ্ছেদ (Article 324) অনুযায়ী এই ক্ষমতা কমিশনের রয়েছে। মে মাসের রায়ে সুপ্রিম কোর্ট মূলত কমিশনের এই যুক্তিই মেনে নিয়েছিল।

তবে রায়ের পরেও বিতর্ক থামেনি। সাংবাদিক সংগঠন রিপোর্টার্স কালেকটিভের একটি স্বাধীন বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছিল, বিহারের চূড়ান্ত তালিকাতেও প্রায় চোদ্দ লক্ষ সন্দেহজনক ডুপ্লিকেট ভোটার এবং প্রায় সওয়া কোটি ভোটার অস্তিত্বহীন বা সন্দেহজনক ঠিকানায় নথিভুক্ত রয়ে গিয়েছেন। কমিশন অবশ্য এই দাবি খারিজ করে জানিয়েছিল, তালিকা ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ সংশোধিত।

এই পরিস্থিতিতে সূর্যকান্তকে পাঠানো নতুন চিঠির আসল লক্ষ্য সম্ভবত আইনি লড়াই নয়, রাজনৈতিক বার্তা। সুপ্রিম কোর্টের রায় উল্টে দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু এসআইআরের আসন্ন তৃতীয় পর্বে যাতে একই প্যাটার্নের পুনরাবৃত্তি না হয়, সেই দাবিতে চাপ তৈরি করে রাখাই বিরোধী শিবিরের কৌশল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।আপ-ডিএমকের মতো কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্কে বিমুখ দলের সইয়ের মধ্যে দিয়ে ইন্ডি জোট বার্তা দিতে চাইছে, সাংগঠনিক বৈঠকে দূরত্ব থাকলেও এসআইআর প্রশ্নে বিরোধী ঐক্যে চিড় নেই।

চিঠিতে ঠিক কী কী দাবি তোলা হয়েছে, তার সম্পূর্ণ বয়ান এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। প্রধান বিচারপতির দপ্তর থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি এখনও।