বিজয়া দশমীতে রাবণ দহনের মঞ্চ থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি শত্রুদের বিরুদ্ধে এককাট্টা হওয়ার কড়া বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পূর্ব দিল্লির পটপরগঞ্জের আইপি এক্সটেনশনের উৎসব ময়দানে শ্রী রামলীলা কমিটি ইন্দ্রপ্রস্থ আয়োজিত দশেরার অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। সেখান থেকেই দেশবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান, ভারতের সম্মান ও মর্যাদায় যারা আঘাত হানে, সমাজে বিভেদের বীজ ছড়ায় এবং দেশের প্রাচীন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি ঘৃণা পোষণ করে– তারাই ভারতের প্রকৃত শত্রু। ভারত মাতার এই শত্রুদের চিহ্নিত করে জোটবদ্ধভাবে তাদের পরাজিত করার সঙ্কল্প নিতে হবে।
রাজনৈতিক জল্পনা
প্রাচীন ঋষিদের বাণী স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ দিন বলেন, দেশের স্বার্থ ও নিরাপত্তার প্রশ্নে সমস্ত রাজনৈতিক দল এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে একই লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে রাষ্ট্রের শত্রুদের মোকাবিলা করাই সময়ের দাবি।
প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজধানীর রাজনৈতিক অলিন্দে তীব্র চর্চা শুরু হয়েছে। গত দু’সপ্তাহ ধরে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের অপসারণ ও ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রতিবাদে ককরোচ জনতা পার্টি, ছাত্র সংগঠন এবং বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের আন্দোলনে উত্তাল ছিল দিল্লি। শাসক শিবির প্রথম থেকেই এই আন্দোলনের নেপথ্যে দেশবিরোধী ও বিদেশি শক্তির প্ররোচনার অভিযোগ তুলে সরব হয়েছিল। ঠিক যেদিন আন্দোলনকারীরা দীপাবলি পর্যন্ত বিক্ষোভ স্থগিত রাখার কথা ঘোষণা করল, সেদিনই সন্ধ্যায় দিল্লির বুক থেকে দেশের মর্যাদা ক্ষুণ্ণকারী ও বিভেদকামীদের শত্রু হিসেবে দেগে দিয়ে মোদী আসলে আন্দোলনকারী ও বিরোধী শিবিরকেই প্রচ্ছন্ন বার্তা দিলেন কি না, তা নিয়ে জল্পনা দানা বেঁধেছে।<blockquote class=”twitter-tweet”><p lang=”en” dir=”ltr”>Vijaya Dashami celebrates the victory of good over evil. It reminds us of the enduring strength of truth and righteousness. https://t.co/jJSlQdNhu2</p>— Narendra Modi (@narendramodi) <a href=”https://x.com/narendramodi/status/2112529052976501091?ref_src=twsrc%5Etfw”>October 20, 2026</a></blockquote> <script async src=”https://platform.x.com/widgets.js” charset=”utf-8″></script>
রামরাজ্যের শাসননীতি
ভাষণের শুরুতেই শ্রীরাম, মাতা জানকী এবং বজরংবলীর চরণে প্রণাম জানিয়ে দেশবাসীকে বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী। দিল্লি বিজেপির সভাপতি হর্ষ মালহোত্রাকে পাশে নিয়ে প্রতীকী রাবণ দহনেও অংশ নেন তিনি। মোদীর কথায়, ভারতের প্রতিটি গ্রামে ও শহরে আজ রামলীলার মাধ্যমে শ্রীরামের আদর্শ জীবন্ত হয়ে উঠেছে। রামলীলা কেবল একটি উৎসব নয়, এটি ভারতের প্রাণশক্তি। এই উৎসব অত্যাচার ও সন্ত্রাসের অবসানের প্রকাশ্য ঘোষণা এবং মিথ্যার ওপর চিরন্তন সত্যের বিজয়ের প্রমাণ।
শ্রীরামের জীবনাদর্শ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সিংহাসন লাভের আনন্দে বা বনবাসের দুঃখে শ্রীরাম কখনও বিচলিত হননি, চরম সংকটেও সত্য ও ধর্মের পথ ত্যাগ করেননি। বনবাসে নিষাদরাজকে আলিঙ্গন এবং মাতা শবরীর আতিথেয়তা গ্রহণের মাধ্যমে তিনি সামাজিক সম্প্রীতি ও করুণার সর্বোচ্চ মানদণ্ড স্থাপন করেছিলেন। মোদীর ব্যাখ্যায়, রামরাজ্য মানে এমন এক শাসনব্যবস্থা যেখানে কোনও বৈষম্য থাকবে না, প্রত্যেকে ন্যায়বিচার ও সমান সুযোগ পাবেন এবং দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের কল্যাণই হবে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ক্ষমতার উদ্দেশ্য শাসন করা নয়, বরং জনসেবা করা। তাই জনগণকে জনার্দন হিসেবে মেনে নাগরিক দেবো ভব নীতি নিয়ে এগিয়ে চলার বার্তা দেন তিনি।
রাম থেকে রাষ্ট্রের সঙ্কল্প
দেশের অগ্রগতির সঙ্গে সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদার যোগসূত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, যে দেশ নিজের ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করতে জানে না, তারা কখনও এগিয়ে যেতে পারে না। এই প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, গত ১২ বছরে বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া ৬৫০টিরও বেশি প্রাচীন মূর্তি ও ঐতিহাসিক নিদর্শন ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। পাশাপাশি ইউনেস্কোর পক্ষ থেকে দীপাবলি উৎসবকে মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও ভারতের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক মর্যাদার প্রমাণ বলে জানান তিনি।
অযোধ্যায় রামমন্দিরের প্রাণপ্রতিষ্ঠার সময়ে নেওয়া সঙ্কল্পের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মোদী বলেন, ভারতের লক্ষ্য হল রাম থেকে রাষ্ট্র এবং দেব থেকে দেশের চেতনায় উত্তরণ। দেশবাসীর কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং স্বনির্ভরতার মন্ত্রই ভারতকে আত্মনির্ভর ও বিকশিত ভারতের লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে। সামাজিক বিভাজন ও সাংস্কৃতিক বিদ্বেষকে সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার পরিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করে বিজয়া দশমীর মঞ্চ থেকে দেশবাসীকে একজোট থাকার শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।