দিল্লির মালব্য নগরের আগুনে একের পর এক গাফিলতির অভিযোগ, গ্রেপ্তার হোটেল মালিক

Picture: IANS

 দক্ষিণ দিল্লির মালব্য নগরের হাউজ রানি এলাকায় ‘ফ্লারিশ স্টে’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, এলপিজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নয়, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল।
তবে ভবনের ভিতরে বেশ কিছু বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডার মজুত থাকায় আগুন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ইতিমধ্যেই হোটেলের মালিক লভকেশ বাজাজকে গ্রেপ্তার করেছে দিল্লি পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে অবহেলার কারণে মৃত্যু-সহ একাধিক ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক স্তরে কোনও গাফিলতি ছিল কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, হোটেলটিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রচুর গলদ ছিল। পুরো হোটেলটিতে যাতায়াতের জন্য ছিল মাত্র একটি প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ। কোনও জরুরি ‘ফায়ার এক্সিট’ ছিল না। ঘরের জানলাগুলো স্থায়ীভাবে সিল করা ছিল। ফলে ধোঁয়া বের হওয়ার সুযোগ পায়নি। বহু অতিথি ভিতরেই আটকে পড়েন। এমনকি সেন্সর-চালিত মূল দরজাও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর জ্যাম হয়ে যায় বলে অভিযোগ।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, হোটেলের বেসমেন্ট ও ছাদে ২টি রান্নাঘর ছিল এবং সেখানে একাধিক বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডার মজুত রাখা হয়েছিল। যদিও এখনও পর্যন্ত কোনও সিলিন্ডার বিস্ফোরণের প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা বৈদ্যুতিক তার, এয়ার কন্ডিশনিং ইউনিট এবং বিদ্যুৎ সংযোগ পরীক্ষা করে দেখছেন।

হোটেলটির বৈধ ফায়ার সেফটি ক্লিয়ারেন্স বা ফায়ার এনওসি ছিল না। এছাড়াও ঘরের সংখ্যা অনুমোদন পাওয়া ঘরের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। অতিরিক্ত তলাও নির্মাণ করা হয়েছিল। এই সমস্ত নিয়মভঙ্গই মৃত্যুর সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছে প্রশাসন।

বুধবার সকালে পাঁচতলা ওই ‘বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট’ হোটেলে আগুন লাগে। মুহূর্তের মধ্যে ঘন ধোঁয়া ও আগুন গোটা হোটেলে ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনায় অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে বহু বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। আহত হয়েছেন বহু মানুষ যাঁদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক।

এই মর্মান্তিক ঘটনার মধ্যেই মানবিকতার পরিচয় দেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আগুন লাগার পর হোটেলের সামনে গদি ও তোশক বিছিয়ে আটকে পড়া পর্যটকদের লাফ দিয়ে প্রাণ বাঁচানোর সুযোগ করে দেন এলাকার যুবকেরা। আহতদের উদ্ধার করা , সিপিআর দেওয়া এবং হাসপাতালে পাঠানোর কাজে তাঁরা ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রশাসনের মতে, স্থানীয়দের মধ্যে এই তৎপরতা না থাকলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারত।  


এই অগ্নিকাণ্ডে সবচেয়ে মর্মান্তিক ক্ষতির মুখে পড়েছে হরিয়ানার অগ্রবাল পরিবার। হাসপাতালে ভর্তি গুরুতর অসুস্থ বাবা রাধেশ্যাম অগ্রবালের সঙ্গে শেষবার দেখা করতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দিল্লিতে এসেছিলেন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বিবেক অগ্রবাল।

হাসপাতালের কাছে হওয়ায় এই হোটেলটিতেই উঠেছিলেন তাঁরা। কিন্তু বুধবারের ভয়াবহ আগুনে বিবেক, তাঁর স্ত্রী, দুই কন্যা-সহ পরিবারের ৮ সদস্যের মৃত্যু হয়। অসুস্থ বাবার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর উদ্দেশ্যে আসা পরিবারটির এমন করুণ পরিণতি ঘটনাকে আরও বেদনাদায়ক করে তুলেছে।

মালব্য নগরের এই অগ্নিকাণ্ড ফের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে রাজধানীর বহু হোটেল ও বাণিজ্যিক বহুতলের অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট এখনো না পাওয়া গেলেও প্রাথমিক তথ্যে ইঙ্গিত, একাধিক গাফিলতিই এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির কারণ।