নিট-ইউজি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে ততই সামনে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। এই ঘটনায় রাজস্থানের জামওয়া রামগড়ের দুই ভাই মাঙ্গিলাল ও দীনেশ বিওয়ালকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থার সূত্রের দাবি, তাঁরা পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগে গুরুগ্রামের এক চিকিৎসকের কাছ থেকে ৩০ লক্ষ টাকায় প্রশ্নপত্র কিনেছিলেন।
পরে সেই প্রশ্নপত্র আরও কয়েক জনের কাছে মোটা টাকায় বিক্রি করা হয়। ধৃতদের মধ্যে এক জনের ছেলে আবার সীকরে থেকে নিটের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তদন্তকারীরা মনে করছেন, রাজস্থানের সীকরই ছিল প্রশ্নফাঁস চক্রের প্রধান কেন্দ্র।
অন্যদিকে মহারাষ্ট্রের নাসিক থেকে ১০ লক্ষ টাকায় নিটের প্রশ্নপত্র কিনে তা ১৫ লক্ষ টাকায় হরিয়ানায় বিক্রি করা হয়েছিল। এই ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে শুভম খৈরনার নামে এক আয়ুর্বেদিক পড়ুয়াকে। ব্যাচেলর অফ আয়ুর্বেদিক মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি বা বিএএমএসয়ের ছাত্র শুভম নাসিকের নন্দগাঁওয়ের বাসিন্দা। তাঁর বাবা পেশায় চিকিৎসক।
তদন্তে উঠে এসেছে এমবিবিএস কাউন্সেলিং এজেন্ট রাকেশ কুমার মান্দাওয়ারিয়ার নামও। অভিযোগ, তিনি প্রশ্নপত্র বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে বিলি করেছিলেন এবং অন্তত ৭০০ পড়ুয়ার কাছে তা পৌঁছে দেন। দেরাদুন থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া হরিয়ানা থেকে যশ যাদব নামে আরও এক অভিযুক্তকে ধরা হয়েছে।
রাজস্থানের দুই ভাই মাঙ্গিলাল এবং দীনেশ বিওয়ালের বিরুদ্ধে অভিযোগ, এই দুই ভাই গুরুগ্রামের চিকিৎসকের সঙ্গে এক এজেন্টের মাধ্যমে যোগাযোগ করেছিলেন। এঁদেরই মধ্যে এক জনের ছেলে নিটের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। গুরুগ্রামের চিকিৎসকের কাছ থেকে পাওয়া সেই প্রশ্নপত্র ছেলেকে দেন তিনি।
এরপর ২৯ এপ্রিল জামওয়া রামগড় থেকে আড়াই ঘণ্টার দূরত্বে এক জায়গায় যান অভিযুক্ত দুই ভাই। সেখান থেকেই ওই প্রশ্নপত্র টাকার বিনিময়ে বিলি করা হয়েছিল বলে তদন্তকারী সূত্রের খবর। প্রাথমিক তদন্তের পর জানা গিয়েছে, দুই ভাইয়ের সঙ্গে চিকিৎসকের যোগাযোগ মাসখানেক আগে হয়েছিল। অভিযুক্তদের মধ্যে দীনেশের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের ওঠাবসাও রয়েছে। একটি দলের সঙ্গেও জড়িত তিনি।
সূত্রের খবর, ওই প্রশ্নপত্র সীকরের বাসিন্দা রাকেশকুমার মান্দাওয়ারিয়া নামে ডাক্তারি কোর্সের কাউন্সেলিং এজেন্টকে বিক্রি করা হয়। অভিযোগ, রাকেশকুমার সেই প্রশ্নপত্র সীকরের বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে বিলি করেন। জানা গিয়েছে, রাকেশ তাঁর এক পরিচিত ব্যক্তিকেও ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র বিক্রি করেন। ওই ব্যক্তি আবার কেরলে ডাক্তারি পড়ছেন।রাকেশের পরিচিত ওই ডাক্তারি পড়ুয়া আবার সেই প্রশ্নপত্র সীকরে তাঁর বাবার কাছে পাঠিয়ে দেন। ওই পড়ুয়ার বাবা সীকরে কোচিংয়ে আসা ছাত্রছাত্রীদের ঘর ভাড়ার ব্যবস্থা করে দেন।
তদন্তকারীরা একটি মেসেজ উদ্ধার করেন যেখানে লেখা ছিল, ‘বাবা, সীকর থেকে আমার এক বন্ধু এই প্রশ্ন পাঠিয়েছে। তোমার হস্টেলের মেয়েদের কাছে এটি বিলি করে দিও। কালকের পরীক্ষায় কী কী আসবে, এর মধ্যে সব আছে।’ তদন্তকারীদের অনুমান, এরপরই ওই পড়ুয়ার বাবা মেয়েদের হস্টেলে এই প্রশ্নপত্র বিলি করেন।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ দাবি করেছিল যে, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে মহারাষ্ট্রের নাসিক থেকে। কিন্তু তদন্ত যত এগিয়েছে, দেখা গিয়েছে প্রশ্ন ফাঁসের কেন্দ্র হরিয়ানার গুরুগ্রাম। আর এই প্রশ্ন ফাঁসের অন্যতম ‘মাথা’ গুরুগ্রামের এক চিকিৎসক। তাঁর কাছ থেকেই রাজস্থানের দুই ভাই ৩০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন কিনেছিলেন বলে অভিযোগ।
তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, মহারাষ্ট্রের নাসিকের বাসিন্দা শুভম পুণের ধনঞ্জয় নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। অভিযোগ, নাসিক থেকে ১০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন কিনে ১৫ লক্ষ টাকায় হরিয়ানায় বিক্রি করা হয়েছিল।
টেলিগ্রাম অ্যাপের মাধ্যমে সেই প্রশ্ন বিভিন্ন গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তদন্তকারীদের সন্দেহ, এই চক্র মহারাষ্ট্র থেকে শুরু করে হরিয়ানা, রাজস্থান, বিহার, জম্মু-কাশ্মীর ও কেরল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। নাসিক পুলিশের অপরাধদমন শাখার হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন অভিযুক্ত আয়ুর্বেদিক পড়ুয়া। তাঁকে সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
তদন্তের সূত্র হিসেবে তদন্তকারীদের হাতে এসেছে একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম চ্যাট। সেখানে পরীক্ষার আগের দিন প্রশ্নপত্র পাঠিয়ে লেখা হয়েছিল, ‘কালকের পরীক্ষায় এগুলোই আসবে।’ একটি ‘গেজ পেপার’-এর ৪১০টি প্রশ্নের মধ্যে অন্তত ১২০টি মূল প্রশ্নপত্রের সঙ্গে হুবহু মিলে গিয়েছে বলে দাবি রাজস্থান পুলিশের স্পেশাল অপারেশন গ্রুপের। অন্য একটি সূত্রের দাবি, ২৮১টি প্রশ্নের মধ্যে ১৩৫টি প্রশ্নও মিলে গিয়েছে।
রাজস্থান পুলিশের স্পেশ্যাল অপারেশন গ্রুপের সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন ১৫০ জন নিট পড়ুয়া এবং ৭০ জন অভিভাবক। তাঁদের কাছেও পৌঁছেছিল ফাঁস হওয়া এই প্রশ্নপত্র। রাজস্থান পুলিশের এসওজি ১৩ জন এমবিবিএস কাউন্সেলরকে গ্রেপ্তার করেছে।
প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। প্রায় ২৩ লক্ষ পরীক্ষার্থী এই পরীক্ষায় বসেছিলেন। বিরোধী দলগুলিও কেন্দ্রকে তীব্র আক্রমণ করেছে। রাহুল গান্ধী এবং অরবিন্দ কেজরিওয়ালl-সহ বিরোধী নেতারা এনটিএর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
বিতর্ক বাড়তেই ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি ৩ মে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি ২০২৬ পরীক্ষা বাতিল করেছে। কেন্দ্রের নির্দেশে সিবিআই তদন্তভার গ্রহণ করেছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু হয়েছে। এনটিএ জানিয়েছে, আগামী ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে আবার পরীক্ষার দিন ঘোষণা করা হবে।