দেশের অর্থনীতির প্রকৃত ও বাস্তবসম্মত ছবি তুলে ধরতে এক বড়সড় সংস্কারের পথে হাঁটছে কেন্দ্র। জিডিপি (GDP), খুচরো মূল্যবৃদ্ধির সূচক (CPI) এবং শিল্পোৎপাদন সূচক (IIP)-এর ভিত্তিবর্ষ বা ‘বেস ইয়ার’ বদলানোর প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। একই সঙ্গে, প্রশাসনের হাতে থাকা বিপুল তথ্যভান্ডারকে (অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডেটা) ভবিষ্যতের নীতি নির্ধারণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে সরকার।
২০ তম জাতীয় সংখ্যাতত্ত্ব দিবসের (Statistics Day 2026) অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর প্রধান সচিব ড. পিকে মিশ্র জানান, ভারতীয় অর্থনীতি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে। আর সেই পরিবর্তনের সঠিক প্রতিফলন ঘটাতেই এই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচকগুলির ভিত্তিবর্ষ নতুন করে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
কেন এই বদল?
অর্থনীতিবিদদের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের খরচের অভ্যাস, শিল্পের পরিকাঠামো, পরিষেবা ক্ষেত্রের পরিধি এবং উৎপাদনের ধরন আমূল বদলে যায়। বহু পুরনো কোনও বছরকে ভিত্তি ধরে বর্তমানের হিসেব কষলে অর্থনীতির আসল চেহারাটা অনেক সময়ই আড়ালে থেকে যায়। ড. মিশ্রের কথায়, জিডিপি, সিপিআই এবং আইআইপি-র নতুন বেস ইয়ার নির্ধারিত হলে ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আরও নির্ভুল ও স্বচ্ছ ছবি সামনে আসবে।
‘জাতীয় সম্পদ’ সরকারি তথ্য
কেবলমাত্র শুকনো পরিসংখ্যান নয়, সরকারি দপ্তরগুলির হাতে থাকা কোটি কোটি তথ্যকে ভবিষ্যতের ‘কৌশলগত জাতীয় সম্পদ’ (Strategic National Asset) হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে কেন্দ্র। প্রধান সচিব জানান, ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’র হাত ধরে সরকারি স্তরে তথ্যের এক বিপুল ভান্ডার তৈরি হয়েছে। এই সমস্ত তথ্যকে এক ছাতার তলায় এনে যদি সুরক্ষিত ও নির্ভরযোগ্য উপায়ে কাজে লাগানো যায়, তবে দেশের আগামী দিনের নীতি নির্ধারণ অনেক বেশি কার্যকর হবে।
লক্ষ্য ‘ডেটা-চালিত’ প্রশাসন ও এআই-এর ব্যবহার
ভবিষ্যতের ভারতকে ‘ডেটা-ড্রিভেন গভর্ন্যান্স’ বা তথ্য-নির্ভর সুশাসনের ওপর দাঁড় করাতে চাইছে নয়াদিল্লি। সেই লক্ষ্যেই এগোচ্ছে AI-ready ডেটাসেট, ওপেন এপিআই (Open API), মেশিন-রিডেবল ডেটা স্ট্যান্ডার্ড, ন্যাশনাল মেটাডেটা স্ট্রাকচার ২.০, ই-পরিসংখ্যান (e-Sankhyiki), গোইস্ট্যাটস (GoIStats), ‘পয়মানা’ (PAIMANA) এবং ই-সাক্ষী (e-SAKSHI)-র মতো একাধিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) ব্যবহারের ক্ষেত্রে তথ্যের গুণমান, স্বচ্ছতা, গোপনীয়তা এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখাই এখন প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন ড. মিশ্র।
‘বিকশিত ভারত’-এর বুনিয়াদ
প্রধানমন্ত্রীর প্রধান সচিব স্পষ্ট করে দেন যে, ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ে তোলার যে লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিয়েছেন, তা পূরণে তথ্যভিত্তিক প্রশাসনের কোনও বিকল্প নেই। তাঁর বক্তব্য, উন্নয়নের সুফল শেষ প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হলে প্রত্যেকের তথ্য নির্ভুলভাবে নথিভুক্ত হওয়া জরুরি। পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা অক্ষুণ্ণ রেখেই আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে।
কেন তাৎপর্যপূর্ণ এই পদক্ষেপ?
অর্থনৈতিক মহলের মতে, এই তিন প্রধান সূচকের ভিত্তিবর্ষ পরিবর্তন স্রেফ কোনও খাতাকলমের কারিগরি সিদ্ধান্ত নয়। এর ওপরেই নির্ভর করে:
• দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক বৃদ্ধির (Economic Growth) খতিয়ান।
• মূল্যবৃদ্ধির সঠিক পরিমাপ ও বাজার দর নিয়ন্ত্রণ।
• শিল্পোৎপাদনের বাস্তব মূল্যায়ন।
• সরকারের ভবিষ্যৎ নীতি ও বাজেট পরিকল্পনা।
• আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের অর্থনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা।
স্বভাবতই, এই দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে অত্যন্ত ইতিবাচক হবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।