একেই বলে ইতিহাসের আশ্চর্য সমাপতন। যে সব মামলা এক সময় সরকার উল্টে দিয়েছিল তাই দেখা যায় পরবর্তী সময়ে আদালতে খারিজ হয়ে যায়। যে সব দুর্নীতির অভিযোগ দেশজুড়ে তোলপাড় তুলেছিল, পরবর্তী সময়ে সেগুলির অনেকগুলিই আদালতে ধোপে টেকেনি। বফর্স থেকে টুজি, আর সাম্প্রতিক দিল্লির আবগারি মামলা— একই সূত্রে গাঁথা যেন এই ঘটনাপ্রবাহ।
১৯৮০–র শেষভাগে সুইডেন থেকে কামান কেনা নিয়ে ওঠা অভিযোগ, অর্থাৎ বোফর্স কেলেঙ্কারি , তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আমূল বদলে দিয়েছিল। ১৯৮৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারান তিনি। ক্ষমতায় আসেন বিশ্বনাথপ্রতাপ সিংহ, যিনি এই ইস্যুতেই জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পরও বফর্সে দুর্নীতির অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি। পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ নরেন্দ্র মোদীর জমানায় ২০১৮ সালে নতুন করে তদন্তের আবেদন করা হলেও শীর্ষ আদালত তা খারিজ করে দেয়।
একই চিত্র দেখা যায় টুজি স্পেকট্রাম বিতর্কে। টুজি মামলা ছিল ২০১৪ সালের আগে রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সরকারকে আক্রমণের বড় অস্ত্র ছিল এই অভিযোগ। কিন্তু ২০১৭ সালে বিশেষ সিবিআই আদালত রায়ে জানায়, স্পেকট্রাম বণ্টনে দুর্নীতির প্রমাণ মেলেনি। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আন্দিমুথু রাজা, করুণানিধির কন্যা কানিমোঝি-সহ সকল অভিযুক্ত ডিএমকে নেতা-নেত্রীরা বেকসুর খালাস পান।
দিল্লির আবগারি নীতিকে ঘিরে দায়ের হওয়া মামলাতেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা গেল। রাউস অ্যাভিনিউ আদালত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী মণীশ-সহ ২১ জনকে মুক্তির রায় দিয়েছে। এঁদের মধ্যে রয়েছেন, তেলঙ্গানার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের কন্যা কে কবিতাও।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে শক্তিশালী প্রমাণ প্রয়োজন, যা তদন্তকারী সংস্থা হাজির করতে পারেনি। ষড়যন্ত্রের যে তত্ত্ব তুলে ধরা হয়েছিল, তা ছিল স্ববিরোধিতায় পূর্ণ। অথচ এই মামলাকে হাতিয়ার করেই কেজরি-সিসোদিয়াকে জেলে পাঠিয়েছিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। আবগারি দুর্নীতি নিয়ে প্রচার-ঝড় তুলে এক বছর আগে আম আদমি পার্টি (আপ) সরকারকে উৎখাত করে দিল্লিতে ক্ষমতা দখল করেছিল বিজেপি।
কোনও তথ্যপ্রমাণ দাখিল করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই। সিবিআইয়ের তরফে অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে, আবগারি দুর্নীতি মামলায় মূল চক্রান্তকারী ছিলেন কেজরিই। সিসোদিয়াকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতের পর্যবেক্ষণ, সিবিআই এমন কোনও তথ্যপ্রমাণ দাখিল করেনি, যা থেকে সিসোদিয়ার অপরাধমূলক আচরণের কোনও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আদালতের বক্তব্য, তদন্তকারী সংস্থার তরফে যে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কথা বলা হয়েছিল, তা স্ববিরোধিতায় ভরা!
শুক্রবার নিম্ন আদালতের বিচারক জিতেন্দ্র সিংহ সিবিআইকে কড়া বার্তা দিয়ে বলেন, অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ হাজির করতে না পারলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের উপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। তাঁর এই মন্তব্য অনেকেরই মনে করিয়ে দেয় ২০১৭ সালে ২জি স্পেকট্রাম মামলার ঐতিহাসিক রায়কে।
সে বছর বিশেষ আদালত ১,৫৫২ পাতার রায়ে জানায়, প্রায় ১ লক্ষ ৭৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির যে অভিযোগ সিএজি তুলেছিল, তা প্রমাণিত হয়নি। আদালত স্পষ্ট জানায়, সিবিআই ও ইডি ৩৫ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনা কোনও অভিযোগই প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বাছাই করা তথ্য ও জল্পনার ভিত্তিতে দুর্নীতির চিত্র তৈরি হয়েছিল বলেও পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়।
উল্লেখ্য, এই ২জি স্পেকট্রাম বরাদ্দ সংক্রান্ত বিতর্ক ঘিরেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন সরকার প্রবল চাপে পড়ে। পরবর্তী সময়ে দুর্নীতির অভিযোগকে বড় রাজনৈতিক ইস্যু করে ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি।
ঘটনাচক্রে, দিল্লিতে বিজেপি নেত্রী রেখা গুপ্তা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার বর্ষপূর্তি হয় আবগারি মামলার রায় ঘোষণার ঠিক এক সপ্তাহ আগে। ফলে বফর্স থেকে ২জি, আর সাম্প্রতিক আবগারি মামলা— একাধিক বহুচর্চিত দুর্নীতি অভিযোগ আদালতে খারিজ হওয়ার ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক তাৎপর্য তৈরি হয়েছে।