ইতিহাসে প্রথম ৩০ ডিগ্রি ছুঁল প্রশান্ত মহাসাগরের জল, ‘সুপার এল নিনো’-র জেরে এবার বাংলায় শীতকাল নেই?

El Nino makes history: Pacific Ocean temperatures touch 30°C for first time (Image: Magnific)

বিশ্ব উষ্ণায়নের (Global Warming) যুগে আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা নতুন নয়। কিন্তু ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসের শেষবেলায় প্রশান্ত মহাসাগরের (Pacific Ocean) বুকে যা ঘটল, তা আবহবিদদের কপালে ভাঁজ ফেলার জন্য যথেষ্ট। নজিরবিহীন ভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে প্রশান্ত মহাসাগরের জল। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে, অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে এ বারের ‘এল নিনো’ (El Nino 2026)। আমেরিকার ‘জাতীয় মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন’ বা ‘নোয়া’ (NOAA)-র তথ্য বলছে, ইতিহাসে প্রথমবার বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের জলতলের তাপমাত্রা ছুঁয়ে ফেলেছে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (30°C Milestone) গণ্ডি! আর তার জেরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, তবে কি এ বছর ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গে জাঁকিয়ে শীত (Winter Forecast) পড়ার আশায় জল ঢালতে চলেছে এই মহাসাগরীয় উষ্ণ স্রোত?

কী ঘটেছে প্রশান্ত মহাসাগরে?

মার্কিন সংস্থা ‘নোয়া’ (US National Oceanic and Atmospheric Administration) এবং ‘ক্লাইমেট রিঅ্যানালাইজার’ (Climate Reanalyzer)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ অক্টোবর মধ্য-বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের জলতলের গড় তাপমাত্রা (Sea Surface Temperature) ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। উল্লেখ্য, প্রশান্ত মহাসাগরের এই নির্দিষ্ট অঞ্চলটির দিকেই সারাবছর কড়া নজর থাকে বিজ্ঞানীদের, কারণ এখানকার জলের উষ্ণতা দেখেই ‘এল নিনো’-র গতিপ্রকৃতি মাপা হয়। আধুনিক আবহাওয়া বিজ্ঞানের ইতিহাসে যত দিন থেকে তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে, তার মধ্যে এই অঞ্চলের তাপমাত্রা কখনও ৩০ ডিগ্রির কোঠা ছোঁয়নি।


বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বা ‘ডব্লিউএমও’ (World Meteorological Organization-WMO) জানিয়েছে, এ বছর জুন মাস থেকেই প্রশান্ত মহাসাগরের ‘নিনো ৩.৪’ (Nino 3.4 Region) অঞ্চলের তাপমাত্রা লাফিয়ে বাড়ছে। জুনে এই অঞ্চলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল, যা আগস্টে বেড়ে দাঁড়ায় ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। কিন্তু আসল অশনি সঙ্কেত লুকিয়ে রয়েছে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাসের (October-December Forecast) পূর্বাভাসে। ডব্লিউএমও-র আশঙ্কা, চলতি বছরের শেষ তিন মাসে এই তাপমাত্রার বিচ্যুতি (Temperature Anomaly) স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস উপরে উঠে যেতে পারে!

কতটা ভয়ঙ্কর এই পরিসংখ্যান? সহজ কথায়, এর আগে ২০১৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে যে প্রবল ‘সুপার এল নিনো’ (Super El Nino) দেখা গিয়েছিল, তখন সর্বোচ্চ বিচ্যুতি ছিল ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ, এক দশক আগের সেই সর্বকালীন রেকর্ডকেও এ বার অনায়াসে ছাপিয়ে যেতে চলেছে ২০২৬-এর এল নিনো।

কেন এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা?

সহজ ভাষায় ‘এল নিনো’ (El Nino-Southern Oscillation বা ENSO) হল একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত প্রক্রিয়া। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাণিজ্য বায়ু (Trade Winds) উষ্ণ জলরাশিকে ধাক্কা দিয়ে এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার দিকে নিয়ে আসে। কিন্তু এল নিনো সক্রিয় হলে এই বাতাসের গতি দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের জল অস্বাভাবিক রকম গরম হতে শুরু করে। সমুদ্রের এই অতিরিক্ত তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে মেঘের সঞ্চার এবং বাতাসের গতিপথকে ওলটপালট করে দেয়, যার প্রভাব পড়ে সুদূর ভারত মহাসাগর থেকে শুরু করে গোটা বিশ্বের আবহাওয়ার (Global Weather Pattern) উপর।

ডব্লিউএমও-র মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো (Celeste Saulo) এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘের মানবিক বিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল তথা জরুরি ত্রাণ সমন্বয়কারী টম ফ্লেচার (Tom Fletcher) ইতিমধ্যেই জেনিভা থেকে যৌথ বিবৃতি দিয়ে বিশ্বজুড়ে আগাম সতর্কবার্তা (Early Action Warning) জারি করেছেন। বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস, আগামী ডিসেম্বর মাসে (December Peak) এই এল নিনো তার সর্বোচ্চ শক্তিতে পৌঁছবে এবং ২০২৭ সালের শুরুর দিক (Early 2027) পর্যন্ত এর দাপট অব্যাহত থাকবে।

ভারতের কপালে চিন্তার ভাঁজ

ভারতের আবহাওয়া এবং কৃষির (Indian Agriculture) সঙ্গে এল নিনোর সম্পর্ক বরাবরই তিক্ত। মৌসম ভবনের (India Meteorological Department-IMD) পরিসংখ্যান বলছে, সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ সালের দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর মরশুমে (Southwest Monsoon) দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১৩ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত (Rainfall Deficit) হয়েছে। এর জেরে দেশে খরিফ শস্যের (Kharif Crops) চাষ ইতিমধ্যেই ধাক্কা খেয়েছে।

কিন্তু বর্ষা বিদায় নিলেও বিপদ কাটেনি। ডব্লিউএমও-র অক্টোবর মাসের পূর্বাভাস (October Outlook) বলছে, আগামী কয়েক মাসে ভারত-সহ গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় (South Asia) গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে মধ্য এবং দক্ষিণ ভারতের উপদ্বীপীয় অঞ্চলে (Central and Southern Peninsular India) স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হতে পারে। এল নিনো ডিসেম্বরে শীর্ষে পৌঁছনোর অর্থ হল, উত্তর ও মধ্য ভারতে শৈত্যপ্রবাহের (Cold Wave) দিন সংখ্যা কমে যাওয়া এবং সামগ্রিক ভাবে একটি ‘উষ্ণ শীত’ (Warm Winter)-এর মুখোমুখি হওয়া। যদিও ভারত মহাসাগরের নিজস্ব সমীকরণ অর্থাৎ ‘ইন্ডিয়ান ওশান ডাইপোল’ (Indian Ocean Dipole-IOD) এবং স্থানীয় বায়ুপ্রবাহ এই প্রভাব কিছুটা কমাতে পারে, তবুও প্রশান্ত মহাসাগরের ৩০ ডিগ্রির উষ্ণতা ভারতের জন্য বড়সড় উদ্বেগের কারণ।

বাংলার শীতে প্রভাব

সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে এল নিনোর প্রভাবে বর্ষায় ১৩ শতাংশ ঘাটতি থাকলেও, পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal Weather) ছবিটা ছিল বেশ চমকপ্রদ। আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের আঞ্চলিক অধিকর্তা ড. হাবিবুর রহমান (Dr. Habibur Rahman) আগেই স্পষ্ট করেছিলেন যে, এল নিনো একটি বিশ্বজনীন ঘটনা (Global Phenomenon) এবং আঞ্চলিক স্তরে এর প্রভাব সব জায়গায় সমান হয় না। বঙ্গোপসাগরে (Bay of Bengal) পর পর নিম্নচাপ তৈরি হওয়ায় এ বছর বর্ষায় দক্ষিণবঙ্গে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে (কলকাতায় প্রায় ২১ শতাংশ বেশি), যদিও উত্তরবঙ্গে কিছুটা ঘাটতি ছিল।

কিন্তু বর্ষা বিদায়ের পর হেমন্তের শুরুতেই বাংলার আবহাওয়ায় (Bengal Winter Forecast) এল নিনো ও সমুদ্রের উষ্ণতার পরোক্ষ প্রভাব টের পাওয়া যাচ্ছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে (১৫ থেকে ২১ অক্টোবর) বাংলায় বৃষ্টির ঘাটতি ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ। দুর্গাপুজোর পর শ্রীনিকেতন, পুরুলিয়া বা আলিপুরদুয়ারে ভোরের দিকে হালকা শীতের আমেজও মিলতে শুরু করেছিল। কিন্তু সমুদ্রের জল উষ্ণ থাকায় ফের বঙ্গোপসাগরে দানা বেঁধেছে নতুন নিম্নচাপ, যা গভীর নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ের (Cyclone Alert) রূপ নিয়ে চলতি মাসের শেষ ভাগে (২৮-৩০ অক্টোবর) দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে অসময়ের ঝড়বৃষ্টি ঘটাতে পারে।

আবহবিদদের মতে, ডিসেম্বরে এল নিনো তার চরম পর্যায়ে (Peak Stage) পৌঁছলে বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন অঞ্চলে জলীয় বাষ্পের জোগান এবং ঘূর্ণাবর্তের প্রবণতা বাড়তে পারে। বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি থাকলে এবং পশ্চিমি ঝঞ্ঝার (Western Disturbance) ছন্দ বিঘ্নিত হলে কাশ্মীর বা হিমালয় সংলগ্ন অঞ্চল থেকে কনকনে উত্তুরে হাওয়া (North-Westerly Wind) অবাধে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে ঢুকতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। ডব্লিউএমও-র পূর্বাভাস অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ায় শীতকালীন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের উপরে থাকলে, এ বছর কলকাতায় ও দক্ষিণবঙ্গে জাঁকিয়ে শীতের স্থায়িত্ব কম হতে পারে। রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২-৩ ডিগ্রি বেশি থাকলে আলু, সর্ষে এবং গমের মতো বাংলার প্রধান রবি শস্যের (Rabi Crops in Bengal) ফলনেও তার বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না কৃষিবিজ্ঞানীরা।

সব মিলিয়ে, প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে বাসা বাঁধা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের এই ‘সুপার এল নিনো’ শুধু একটি পরিসংখ্যানগত রেকর্ড নয়, বরং আগামী কয়েক মাসে ভারত ও বাংলার জলবায়ু, শীতের আমেজ এবং অর্থনীতির সামনে এক বড়সড় অগ্নিপরীক্ষা।