ইথানল জ্বালানি নিয়ে যাবতীয় বিভ্রান্তির অবসান: মাইলেজ থেকে ইঞ্জিন-ক্ষতি, সব প্রশ্নের জবাব দিল কেন্দ্র

ইথানল নিয়ে বিতর্ক (Magnific)

পরিবেশবান্ধব জ্বালানির প্রচলন বাড়াতে পেট্রলে ইথানল মেশানোর প্রস্তাব করেছেন কেন্দ্রীয়মন্ত্রী নিতিন গডকরী। যার জেরে তৈরি হয়েছে নানা বিভ্রান্তি ও বিতর্ক। ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত পেট্রল ব্যবহার করলেই গাড়ির ইঞ্জিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে, মাইলেজ কমে যাচ্ছে… এমন অগুনতি অভিযোগ ভিড় করছে। সমাজ মাধ্যমে ঘোরাঘুরি করছে নানান কনসপিরেসি থিওরি। এই প্রেক্ষাপটেই শুক্রবার প্রশ্নোত্তরের ঢঙে সহজ ভাষায় ইথানল সংক্রান্ত যাবতীয় বিতর্কের নিষ্পত্তি করল কেন্দ্র।

নেটপাড়ায় কিছুদিন ধরেই তুমুল চর্চায় ই-২০ পেট্রল (E20 Petrol)। কারও দাবি, এই ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি গাড়ির মাইলেজ কার্যত তলানিতে নিয়ে দিচ্ছে, কারও আবার অভিযোগ ইঞ্জিন খারাপ হয়ে যাওয়ার। বিহারের এক ইউটিউবারের ভাইরাল ভিডিও ঘিরে এই আতঙ্ক আরও ছড়িয়ে পড়ার পরে অবশেষে মুখ খুলল কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক (Ministry of Petroleum and Natural Gas)। সবিস্তার এক ব্যাখ্যায় একের পর এক প্রশ্নের জবাব দিয়ে যাবতীয় জল্পনায় জল ঢেলে দিয়েছে সরকার। ঠিক কী কী বলা হয়েছে সেই ব্যাখ্যায়?

মাইলেজ কি সত্যিই ৩০ শতাংশ কমে যাচ্ছে


সবচেয়ে বেশি সংক্রামক দাবিটাই আগে খারিজ করেছে কেন্দ্র। মন্ত্রকের বক্তব্য, ৩০ শতাংশের যে পরিসংখ্যান নিয়ে এত হইচই, তা আসলে ইথানলের ক্যালোরিফিক ভ্যালু বা শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা পেট্রোলের তুলনায় কতটা কম, শুধু সেই তথ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাস্তব জীবনে মাইলেজ হ্রাসের সঙ্গে এর কোনও সরাসরি যোগ নেই। মারুতি সুজুকির তথ্য উদ্ধৃত করে মন্ত্রক জানিয়েছে, লিটারে ২০ কিলোমিটার দেওয়া গাড়িতে বাস্তবে মাইলেজ কমতে পারে বড়জোর ০.৬ কিলোমিটার, যা সামগ্রিক ভাবে ৩ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ড্রাইভিং প্যাটার্ন, টায়ারের চাপ, নিয়মিত সার্ভিসিং এবং এসি ব্যবহারই মাইলেজে অনেক বেশি প্রভাব ফেলে বলেই মত সরকারের।

ইঞ্জিনের কি সত্যিই ক্ষতি হচ্ছে

এই প্রশ্নের উত্তরেও স্পষ্ট আশ্বাস দিয়েছে কেন্দ্র। সিয়াম (Society of Indian Automobile Manufacturers, SIAM), এআরএআই (Automotive Research Association of India, ARAI) এবং ইন্ডিয়ান অয়েলের সঙ্গে দীর্ঘ পরীক্ষার পরেই বাজারে এসেছে এই জ্বালানি। মারুতি সুজুকির ২ কোটি ৮৪ লক্ষ গাড়ির সার্ভিসিং তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, তার মধ্যে দেড় কোটির বেশি গাড়ি তিন বছরের পুরনো হওয়া সত্ত্বেও ই-২০ জনিত কোনও ক্ষতির প্রমাণ মেলেনি। ব্যাপক হারে ইঞ্জিন বিকল হওয়ার কোনও নজিরও চোখে পড়েনি বলে দাবি মন্ত্রকের।

বিমা বা ওয়ারেন্টি কি বাতিল হয়ে যাচ্ছে

এই আশঙ্কাও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে সরকার। বিমা সংস্থা এবং গাড়ি প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির (Original Equipment Manufacturers, OEM) বরাত দিয়ে মন্ত্রকের সাফ কথা, ই-২০ জ্বালানি ব্যবহারের ফলে গাড়ির বিমা বা ওয়ারেন্টির বৈধতায় কোনও প্রভাব পড়ে না। সিয়ামও নিশ্চিত করেছে, নির্ধারিত মান মেনে তৈরি ই-২০ জ্বালানি ব্যবহার করা গাড়ির ওয়ারেন্টি অক্ষুণ্ণ থাকবে।

ফুয়েল ক্যাপে মৌমাছি বা পিঁপড়ে বসার দাবি

ইথানলে চিনি থাকে বলে ফুয়েল ক্যাপে পোকামাকড় জড়ো হচ্ছে, এমন ভাইরাল দাবিও উড়িয়ে দিয়েছে মন্ত্রক। ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, জ্বালানির ইথানল পাতন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, ফলে অবশিষ্ট চিনি একেবারেই থাকে না। উল্টে জ্বালানিতে থাকে পোকামাকড় প্রতিরোধী উপাদান। আর পেট্রলের নিজস্ব গন্ধই এতটাই প্রবল যে তা অন্য যে কোনও আকর্ষণ ছাপিয়ে যায়।

ইথানল কি ট্যাঙ্ক নষ্ট করে দিচ্ছে

ইথানল জল শোষণকারী বা হাইগ্রোস্কোপিক (hygroscopic) পদার্থ, এই যুক্তিতেই আশঙ্কা ছড়িয়েছিল সবচেয়ে বেশি। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের মতো আর্দ্র জলবায়ুর রাজ্যে এই উদ্বেগ আরও প্রাসঙ্গিক। মন্ত্রকের জবাব, জ্বালানি ট্যাঙ্কে জল যাতে না ঢোকে, তা নিশ্চিত করা যে কোনও গাড়ির ক্ষেত্রেই মৌলিক প্রয়োজন, শুধু ইথানল মেশানো জ্বালানির ক্ষেত্রে নয়। আধুনিক গাড়িতে জল ঢোকা আটকাতে আগে থেকেই বিশেষ নকশা এবং সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকে বলেও জানানো হয়েছে।

ইথানল সস্তা হলেও পেট্রলের দাম কেন কমছে না

এই প্রশ্নের উত্তরে খানিকটা খোলসা করেই ব্যাখ্যা দিয়েছে কেন্দ্র। সরকার জানিয়েছে, কৃষকদের ন্যায্য দাম দিতে ভুট্টা থেকে তৈরি ইথানল কেনা হয় প্রায় ৭১ টাকা ৮৬ পয়সা প্রতি লিটার দরে, যার সঙ্গে জিএসটি, পরিবহণ ও মজুতের খরচ আলাদা যোগ হয়। অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল পিছু ৭০ ডলারের কাছাকাছি থাকলে ই-২০ তৈরির খরচ বরং সাধারণ পেট্রলের চেয়ে বেশিই পড়ে। তবে বিশ্ব জুড়ে অস্থিরতার মধ্যেও গত চার বছরে দিল্লিতে পেট্রলের দাম বেড়েছে মাত্র ৫.৫৮ শতাংশ, যেখানে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও বাংলাদেশে এই বৃদ্ধির হার অনেক বেশি। অর্থাৎ, দেশীয় ইথানল মিশ্রণের কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা থেকে অনেকটা রক্ষা পেয়েছেন ভারতীয় গ্রাহকরা, এমনটাই দাবি মন্ত্রকের।

পারফরম্যান্সে কী প্রভাব পড়ছে

ইথানলের অকটেন সংখ্যা (Research Octane Number, RON) প্রায় ১০৮.৫, যেখানে সাধারণ পেট্রলের ক্ষেত্রে তা ৮৪.৪। ই-২০ মিশ্রণের ফলে ভারতীয় পেট্রোলের কার্যকর অকটেন মান বেড়ে হচ্ছে প্রায় ৯৫, যা আধুনিক ইঞ্জিনে দহন প্রক্রিয়া আরও উন্নত করে। ই-২০ উপযোগী গাড়িতে বরং আরও ভাল অ্যাক্সিলারেশন, মসৃণ পারফরম্যান্স এবং কম দূষণ মেলে বলেই দাবি মন্ত্রকের।

ই-২৫ কি এবার চালু

আগামী দিনে ২৫ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত পেট্রল বা ই-২৫ (E25) বাধ্যতামূলক হয়ে যাচ্ছে, এমন গুজবও উড়িয়ে দিয়েছে সরকার। মন্ত্রকের স্পষ্ট বক্তব্য, ই-২৫ এখনও কঠোর পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে, এই মুহূর্তে এই নিয়ে কোনও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা এবং প্রযুক্তিগত যাচাই সম্পূর্ণ হওয়ার পরেই যে কোনও পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।

সার্বিক ভাবে দেশের কী লাভ হচ্ছে

সরকারি হিসেব বলছে, ইথানল মিশ্রণ কর্মসূচির হাত ধরে এ পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়েছে প্রায় ১ লক্ষ ৯৭ হাজার কোটি টাকা, অপরিশোধিত তেল আমদানি কমেছে প্রায় ৩১৬ লক্ষ মেট্রিক টন, কার্বন নিঃসরণ কমেছে প্রায় ৯৫২ লক্ষ মেট্রিক টন এবং কৃষকদের হাতে সরাসরি পৌঁছেছে প্রায় ১ লক্ষ ৬৬ হাজার কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ সালে যেখানে ইথানল মিশ্রণের হার ছিল দেড় শতাংশেরও কম, সেখানে ২০২৫-২৬ সালে তা পৌঁছেছে ২০ শতাংশে, নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই।

কলকাতাতেও কোথায় মিলবে

শুধু জাতীয় স্তরে নয়, খাস কলকাতাতেও এখন সহজলভ্য হচ্ছে ই-২০ পেট্রল। ইন্ডিয়ান অয়েলের তরফে জানানো হয়েছে, ল্যান্সডাউন, প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোড, রাজারহাট, কসবা এবং রবীন্দ্র সদন এলাকার পাম্পগুলিতে ইতিমধ্যে মিলছে এই জ্বালানি। শহরে ইথানল মিশ্রণের হার ২০২৩ সালের ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে হয়েছিল ৪০ শতাংশ, এ বার তা ৯৫ শতাংশে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে সংস্থাটি। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্তাদের আশ্বাস, সঠিক ভাবে ব্যবহার করলে কলকাতার রাস্তায় চলা কোনও গাড়িরই এই জ্বালানিতে কোনও অসুবিধা হবে না।