দেশ ও দশের মঙ্গলের জন্য E20 জ্বালানি বন্ধ হোক, সরকারি নীতিকে বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করালেন কেন্দ্রেরই অর্থ-উপদেষ্টা

ইথানল নিয়ে বিতর্ক (Magnific)

পেট্রল পাম্পে গিয়ে আর কোনও বিকল্প হাতে নেই। ইথানল-মিশ্রিত ই২০ (E20) পেট্রলই এখন একমাত্র ভরসা। ঠিক এই জায়গাতেই প্রশ্ন তুলে দিলেন খোদ কেন্দ্রীয় সরকারের মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা (Chief Economic Adviser, সংক্ষেপে CEA) ভি অনন্ত নাগেশ্বরন।

দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় প্রকাশিত একটি নিবন্ধে তিনি ও অর্থ মন্ত্রকের পরামর্শদাতা আকাশ পূজারি জানিয়েছেন, পুরনো গাড়ি ও বাইকের কথা ভেবে ই১০ (E10) পেট্রলকে ফের অবিলম্বে ফিরিয়ে আনা উচিত। সঙ্গে সতর্কবার্তাও দিয়েছেন তাঁরা, ইথানলের মাত্রা আরও বাড়ানোর আগে ভাত, ভুট্টা, জমি আর জলের হিসেব ভালো করে কষে নেওয়া দরকার।

এই মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণে। ই২০ দেশের প্রায় সব পাম্পে একমাত্র পেট্রল হয়ে ওঠার পর সরকারের অন্দর থেকে এত স্পষ্ট ভাষায় বিকল্প জ্বালানির পক্ষে সওয়াল এই প্রথম।


ইঞ্জিন কি সত্যিই বিগড়ে যাচ্ছে?

সামাজিক মাধ্যমে দাবি উঠেছিল, ই২০ পেট্রলে মাইলেজ প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যাচ্ছে। নাগেশ্বরন সরাসরি সেই দাবি খারিজ করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায়, পেট্রলের তুলনায় ইথানলের শক্তি প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগ। তাই ই২০ ব্যবহারে জ্বালানি ক্ষমতা কমে ঠিকই, তবে তার পরিমাণ ৬ থেকে ৭ শতাংশের বেশি নয়।

আমেরিকা ও ভারতে আলাদা আলাদা পরীক্ষাতেও দেখা গিয়েছে, ই২০ ব্যবহারের যোগ্য গাড়িতে বাড়তি কোনও ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে না। তা হলে আসল সমস্যাটা ঠিক কোথায়?

আসল কাঁটা কোথায়?

বিপদ লুকিয়ে বিএস৪ (BS4) মান চালুর আগে তৈরি প্রায় সাড়ে সাত থেকে আট কোটি ২ চাকার গাড়িতে মানে বাইক, স্টুটার বা স্কুটিতে। এই গাড়িগুলিতে এখনও পুরনো কার্বুরেটর (Carburettor) বসানো। কার্বুরেটর বাতাসে বাড়তি অক্সিজেনের পরিমাণ বুঝতে পারে না। ফলে ইঞ্জিনে প্রয়োজনের তুলনায় কম জ্বালানি ঢোকে, আর ইঞ্জিন গরম হয়ে যায়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রবারের সিলের সমস্যাও। পুরনো গাড়ির রবার অংশ ইথানল সহ্য করার মতো করে তৈরি হয়নি। তাই ধীরে ধীরে সেগুলি ক্ষয়ে যাচ্ছে।

সমাধান অবশ্য আছে। রবার বদলে ফেলা যায় সহজেই, খরচও কম। কিন্তু তা হলে দেশের সব গাড়ি সারাতে হবে একটি একটি করে। কোটি কোটি গাড়িতে এই কাজ শেষ করতে বছরের পর বছর লেগে যাবে।

নাগেশ্বরনের কথায়, শুরুর নকশাতেই এই সমস্যা মাথায় রাখা হয়েছিল। পুরনো গাড়ির জন্য কম ইথানল-মিশ্রিত জ্বালানি পাম্পে রাখার পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই জ্বালানি পাম্প থেকে উধাও হয়ে গিয়েছে। তাঁর সুপারিশ, ই২০-র পাশাপাশি ই১০ ফিরিয়ে আনা হোক। তাতে আতঙ্ক কমবে, মোট ইথানল খরচও বরং কমবে। আর যতদিন না পুরনো গাড়ির লট মেরামত হচ্ছে, ততদিন ইঞ্জিনও থাকবে সুরক্ষিত।

ভাত-ভুট্টার ভাগ বসছে জ্বালানিতে

এখানেই থামেননি মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা। তাঁর আসল উদ্বেগ ইথানলের জোগান নিয়ে। আখ, ভুট্টা এবং খাদ্য নিগমের (Food Corporation of India, FCI) হাতে থাকা উদ্বৃত্ত চাল দিয়েই মূলত তৈরি হয় ইথানল।

লোকসভায় পেশ হওয়া খাদ্য মন্ত্রকের তথ্য বলছে, চলতি ইথানল সরবরাহ বর্ষে জুন পর্যন্ত ভুট্টার ব্যবহার প্রায় ৬৮ লক্ষ টন ছুঁয়েছে। এই প্রথমবার ইথানল তৈরিতে চালের ব্যবহারকে পিছনে ফেলেছে ভুট্টা। একই সময়ে চাল ব্যবহার হয়েছে প্রায় ৫৪ লক্ষ টন।

দামের অঙ্কটাও চোখে পড়ার মতো। রাজ্যসভায় পেশ হওয়া তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য নিগম গত এক বছরে ইথানল কারখানাগুলিকে প্রতি কুইন্টাল চাল বিক্রি করেছে ২,২৫০ থেকে ২,৩২০ টাকায়। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে চালের গড় সংগ্রহমূল্য ছিল কুইন্টাল প্রতি ৩,৭২০ টাকা, পরের অর্থবর্ষে তা বেড়ে হয় ৩,৮৮৯ টাকা। অর্থাৎ কৃষকের থেকে কেনা দামের প্রায় ৪০ শতাংশ কমে চাল যাচ্ছে ইথানল কারখানায়।

নাগেশ্বরন ও পূজারির বক্তব্য স্পষ্ট। দাম আর সেচের জলের হিসেবে যে গরমিল রয়েছে, তার ফায়দা অন্যায় ভাবে পাচ্ছে ভুট্টা, এটা অবিলম্বে ঠিক করা দরকার। ভোজ্য তেলে আমদানি শুল্ক নিয়েও নতুন করে ভাবার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা, যাতে দেশ তৈলবীজেও স্বনির্ভর হতে পারে। তাঁদের স্পষ্ট কথা, ই২৭ বা ই৩০-এর মতো আরও বেশি ইথানল মেশানো পেট্রল আনার আগে জমি আর জলের হিসেব না কষে এগোনো ঠিক হবে না।

পশ্চিমবঙ্গের হিসেব আলাদা?

পশ্চিমবঙ্গের রাস্তায় নজর রাখলেই বোঝা যায়, এই বিতর্কের আঁচ রাজ্যেও কম নেই। শহরতলি হোক বা জেলার প্রত্যন্ত এলাকা, ২ চাকাই এখনও বাঙালির যাতায়াতের প্রধান ভরসা। সে বাইক হোক বা স্কুটি।

আপনার বাড়ির স্কুটার বা মোটরবাইকটি যদি ২০১৬ সালের আগে কেনা হয় এবং তাতে এখনও কার্বুরেটর থাকে, তা হলে এই খবর সরাসরি আপনার সংসারের খরচের হিসেবেও ঢুকে পড়বে। ইঞ্জিন বাঁচাতে অনেকেই তাই ঝুঁকছেন XP100-র মতো দামি প্রিমিয়াম পেট্রলের দিকে, যদিও তার দাম সাধারণ পেট্রলের চেয়ে অনেকটাই বেশি।

খাদ্যশস্যের অঙ্কেও পশ্চিমবঙ্গের প্রাসঙ্গিকতা কম নয়। দেশের বৃহত্তম ধান উৎপাদক রাজ্যগুলির অন্যতম পশ্চিমবঙ্গ, আর ভাতই এই রাজ্যের মূল খাদ্য। চাল যখন কম দামে ইথানল কারখানায় যাচ্ছে, আর জ্বালানির কাঁচামাল হিসেবে ভুট্টা যখন চালকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে, তখন তার ঢেউ ঘুরপথে এসে পড়তে পারে রাজ্যের খাদ্যশস্যের বাজার আর কৃষি-অর্থনীতিতেও।

সংসদেও এই প্রশ্ন উঠেছে। রাজ্যসভায় প্রশ্ন তুলেছিলেন সিপিআই সাংসদ এ এ রহিম। জবাবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিতিন গডকরী জানিয়েছিলেন, একাধিক সরকারি গবেষণা সংস্থার পরীক্ষাতেই ই২০ নিয়ে বড় কোনও যান্ত্রিক গোলযোগের প্রমাণ মেলেনি।

সরকার কী বলছে?

কেন্দ্র অবশ্য নিজের অবস্থান থেকে সরছে না। পেট্রলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছে, সংগ্রহ থেকে বিপণন, প্রতিটি ধাপে মানের নিয়ম মেনেই সরবরাহ হচ্ছে ই২০। কেন্দ্রের দাবি, ইথানল কর্মসূচির হাত ধরে বৈদেশিক মুদ্রা যেমন সাশ্রয় হয়েছে, তেমনই আখ, ভুট্টা ও অন্যান্য কাঁচামাল সরবরাহ করে কৃষকদের ঘরে এসেছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। আপাতত ই২০-র গণ্ডি পেরিয়ে আরও বেশি ইথানল মেশানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও স্পষ্ট করেছে সরকার।

উল্টো দিকে ইথানল শিল্পও নিজেদের অবস্থানে অনড়। অল ইন্ডিয়া ডিস্টিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি কুশল মিত্তল সাফ জানিয়েছেন, ২০১৬ সাল থেকে ধারাবাহিক পরীক্ষা আর ২০২২ সালে গাড়ি প্রস্তুতকারকদের নিয়ে ব্যাপক মূল্যায়নের ভিত্তিতেই চালু হয়েছে ই২০। তাঁর যুক্তি, শুধু জনমতের চাপে বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি পাল্টানো ঠিক হবে না।

লড়াইটা তাই আপাতত এখন স্পষ্ট। এক দিকে সরকারের নিজের অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা বলছেন সতর্ক হতে। অন্য দিকে মন্ত্রক আর শিল্পমহল বলছে এগিয়ে চলাই ঠিক পথ। মাঝখানে দাঁড়িয়ে কোটি কোটি সাধারণ গাড়ি ও বাইক-চালক, যাঁদের হেঁশেল, পকেট আর ইঞ্জিন, তিনটির উপরেই আঁচ পড়ছে এই সিদ্ধান্তের। অতএব, ই১০ আদৌ আর পাম্পে ফেরে কি না, তার উত্তর দেবে সময়ই।