পরকীয়ার অভিযোগ থেকে শুরু হওয়া একটি মামলায় বড়সড় পর্যবেক্ষণ দিল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)। কারও বিরুদ্ধে জোর করে ডিএনএ টেস্ট করানো ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গোপনীয়তার অধিকারে (Right to Privacy) সরাসরি হস্তক্ষেপ বলে জানিয়েছে আদালত। বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র (Justice Prashant Kumar Mishra) ও বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চোলির (Justice Vipul M. Pancholi) ডিভিশন বেঞ্চ মাদ্রাজ হাইকোর্টের (Madras High Court) একটি নির্দেশ খারিজ করে এই মন্তব্য করেছে।
কী ছিল মামলাটি
২০০১ সালে বিয়ে হয় এক মহিলার। স্বামীর চর্মরোগের চিকিৎসার জন্য তাঁরা যান এক চিকিৎসকের কাছে। স্বামী চিকিৎসায় সেরে ওঠার পর সেই চিকিৎসকের সঙ্গেই ওই মহিলার শারীরিক সম্পর্ক তৈরি হয়, যার ফলে ২০০৭ সালে একটি সন্তানের জন্ম হয়। সন্তানের দেড় বছর বয়স পর্যন্ত ওই চিকিৎসকের সঙ্গে নিয়মিত শরীরী সম্পর্ক চালিয়ে যান ওই মহিলা। বিষয়টি জানার পর স্ত্রীকে ছেড়ে চলে যান তাঁর স্বামী। এর পরই ওই মহিলা বিয়ের প্রস্তাব দেন চিকিৎসককে। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করলেই গোলমাল বাধে। পরে এক টিভি অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে ওই চিকিৎসকের অভিযোগ জানান ওই মহিলা। এর ভিত্তিতে প্রতারণা (Cheating) সংক্রান্ত ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪১৭ ও ৪২০ ধারা এবং তামিলনাড়ু নারী হেনস্থা আইনে (Tamil Nadu Women Harassment Act) মামলা রুজু হয় চিকিৎসকের বিরুদ্ধে।
তদন্তের স্বার্থে চিকিৎসক, ওই মহিলা এবং সন্তান, তিনজনের ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের নির্দেশ দেয় মাদ্রাজ হাইকোর্ট। যদিও নির্দেশ মানতে রাজি হননি অভিযুক্ত। মামলা গড়ায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত।
সন্তানের বৈধতার অনুমান
সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, বিবাহিত সম্পর্কে থাকাকালীন জন্ম নেওয়া সন্তানকে আইনত বৈধ সন্তান হিসেবেই ধরে নেওয়া হয়। প্রমাণ আইনের (Evidence Act) ১১২ ধারা অনুযায়ী এই অনুমান একরকম চূড়ান্ত প্রমাণেরই (Conclusive Proof) মর্যাদা পায়। এই অনুমান ভাঙতে হলে দেখাতে হবে, সন্তান গর্ভে আসার সময়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনও সম্পর্কই ছিল না। শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ, এই মামলায় এমন কোনও দাবিই মহিলার তরফে করা হয়নি। সন্তানের জন্ম ও স্কুলের সব নথিতে মহিলার স্বামীর নামই বাবা হিসেবে নথিভুক্ত ছিল।
আদালতের মতে, এই পরিস্থিতিতে ডিএনএ টেস্টের নির্দেশ দেওয়ার অর্থ চিকিৎসক ও শিশু, দু’জনের গোপনীয়তা ও মর্যাদায় সরাসরি আঘাত করা। সংবিধানের ২০(৩) ও ২১ নম্বর ধারায় (Article 20(3), Article 21) সুরক্ষিত অধিকার লঙ্ঘন হয় বলেও জানানো হয়েছে রায়ে।
ডিএনএ পরীক্ষায় না
মামলার মূল অভিযোগ ছিল, প্রতারণা ও হেনস্থা সংক্রান্ত। আদালতের মত, এই ধরনের অভিযোগ প্রমাণে সন্তানের বাবা কে, এটা প্রমাণের প্রয়োজনই নেই। ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ৫৩ ও ৫৩এ ধারা তখনই প্রযোজ্য, যখন কোনও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা সরাসরি অভিযুক্তের অপরাধের প্রমাণ জোগাতে পারে। এখানে তা হয়নি। তাই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে স্রেফ সন্দেহ মেটানোর হাতিয়ার করা যায় না বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে আদালত।
কেন গুরুত্বের
এই রায় সারা দেশের আদালতের জন্য নজির হয়ে থাকবে, পশ্চিমবঙ্গও এর বাইরে নয়। রাজ্যের পারিবারিক আদালতগুলিতে খোরপোশ বা বিবাহবিচ্ছেদের মামলায় প্রায়ই পিতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় এবং ডিএনএ টেস্টের আবেদন জমা পড়ে। নতুন ভারতীয় সাক্ষ্য আইনে (Bharatiya Sakshya Adhiniyam, 2023) পুরনো প্রমাণ আইনের ১১২ ধারাই এখন ১১৬ ধারা হিসেবে বলবৎ, এবং তার নীতি অপরিবর্তিত। ফলে কলকাতা হাইকোর্ট-সহ(Calcutta High Court) রাজ্যের নিম্ন আদালতগুলিতেও ভবিষ্যতে অনুরূপ মামলায় এই রায়ের নীতিই মাপকাঠি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন আইনজীবীরা।