দিল্লির বুকে প্রতিবাদ-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র যন্তর মন্তর (Jantar Mantar)। কিন্তু গুরত্বপূর্ণ এই জায়গাটিকে কি প্রতিবাদস্থল হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া উচিত? এমন প্রশ্ন তুলে রীতিমতো শোরগোল ফেলে দিলেন দিল্লি হাইকোর্টের (Delhi High Court) বিচারপতি অমিত মহাজন। কেন্দ্রের কাছে সরাসরি জানতে চাইলেন, শহরের মাঝখানে এভাবে বারবার প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হতে দেওয়ার যুক্তি কী!
ঘটনার সূত্রপাত
মামলাটা এসেছিল অল ইন্ডিয়া দলিত ক্রিশ্চিয়ান রাইটস প্রোটেকশন কমিটির (All India Dalit Christian Rights Protection Committee) হাত ধরে। তাদের বক্তব্য ছিল, সর্বোচ্চ ৭৫ জনকে নিয়ে জন্তর মন্তরে একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি করার অনুমতি চেয়ে জুলাই মাস থেকে দিল্লি পুলিশের কাছে আবেদন করে বসে আছে তারা। না অনুমতি মিলেছে, না প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এই অনির্দিষ্টকালের নীরবতা নিয়েই আদালতের দ্বারস্থ হয় সংগঠনটি।
শুনানির সময় বিচারপতি মহাজন সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, প্রতিবাদ বা বিক্ষোভের নামে গোটা শহরকে কেন এভাবে বন্দি করে রাখা হবে! তাঁর বক্তব্য, প্রতিবাদ গণতান্ত্রিক না অগণতান্ত্রিক সেই তর্কে তিনি ঢুকছেন না, কিন্তু একটানা রাস্তা আটকে রাখার ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি নিয়েও ভাবা দরকার।
শাহিনবাগের প্রসঙ্গ
আদালতে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল চেতন শর্মা এই মামলায় আদালতে বলেন, যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ হবে কি হবে না, এই বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন। যন্তর মন্তরকে আদৌ নির্দিষ্ট প্রতিবাদস্থল (designated protest site) হিসেবে বিবেচনা করা উচিত কি না, সেই প্রশ্নের নিষ্পত্তি এখনও হয়নি শীর্ষ আদালতে। পিটিশনকারীর আইনজীবী সঞ্জয় ঘোষ পাল্টা মনে করিয়ে দেন, শাহিনবাগ মামলায় (Shaheen Bagh case) সুপ্রিম কোর্ট আগেই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার স্বীকার করেছে। যদিও প্রকৃতপক্ষে সেই রায়েও বলা হয়েছিল, রাস্তা বা প্রকাশ্য স্থান অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখা যাবে না, প্রতিবাদ হতে হবে নির্দিষ্ট জায়গাতেই। শেষ পর্যন্ত আদালত দিল্লি পুলিশকে ৮ আগস্টের মধ্যে আবেদনের নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দিয়ে মামলাটির শুনানি শেষ করে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই বিতর্ক
বাংলার প্রেক্ষাপটেও এই মামলার গতিপ্রকৃতি গুরুত্বের। কারণ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ধর্না বা মিছিলের জায়গা নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। কলকাতার রানি রাসমণি অ্যাভিনিউ (Rani Rashmoni Avenue) বহুদিন ধরেই রাজ্যের রাজনৈতিক প্রতিবাদের অলিখিত ঠিকানা। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে শুরু করে বিরোধী দল, এমনকি আরজি কর কাণ্ডের প্রতিবাদেও এই অঞ্চলই বারবার হয়ে উঠেছে মিছিল আর জমায়েতের কেন্দ্রবিন্দু। প্রশাসনিক অনুমতি নিয়ে টানাপোড়েন, নির্দিষ্ট প্রতিবাদস্থল বেছে দেওয়া, এসপ্ল্যানেডের ওয়াই-চ্যানেলের মতো বিকল্প জায়গায় ঠেলে দেওয়ার ঘটনাও কলকাতায় বিরল নয়।
দিল্লি হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণ তাই শুধু রাজধানীর গণ্ডিতে আটকে থাকার কথা নয়। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকার (Article 19 rights) আর নাগরিক জীবনযাত্রার স্বাভাবিকতা, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কোথায় টানা হবে, সেই প্রশ্ন দেশের যে কোনও প্রান্তেই একইরকম প্রাসঙ্গিক। রাজ্যের রাজনৈতিক দল, প্রশাসন কিংবা নাগরিক আন্দোলনের সংগঠকদের কাছেও এই মামলার ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নজরে রাখার মতো একটি বিষয়।