জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত এবার মুম্বাই, দিল্লি, বেঙ্গালুরুর সঙ্গেই কলকাতায় মোর্চা গড়ার ডাক ককরোচ জনতা পার্টির

CJP's protest at Jantar Mantar (ANI)

জাতীয় নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ স্তরের নজিরবিহীন অভ্যন্তরীণ সংঘাতের জেরে এবার রাজপথ উত্তাল হতে চলেছে। খোদ দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (Chief Election Commissioner বা CEC) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থার দাবিতে আন্দোলনের সুর চড়িয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (Cockroach Janta Party বা CJP)। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বৃহস্পতিবার মুম্বাই প্রেস ক্লাবে (Mumbai Press Club) এক সাংবাদিক বৈঠকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত এই আন্দোলন থামবে না। গান্ধী জয়ন্তীতে মুম্বাইয়ের ঐতিহাসিক শিবাজি পার্কে (Shivaji Park) ‘জেল ভরো আন্দোলন’ (Jail Bharo Andolan) দিয়ে এই কর্মসূচির সূচনা হচ্ছে, যা পরবর্তী পর্যায়ে কলকাতা, বেঙ্গালুরু, গোয়া এবং রাঁচি হয়ে চলতি মাসের শেষে দিল্লির যন্তর মন্তরে পৌঁছবে।

কমিশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভের আগুন

বিতর্কের মূল উৎস জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India বা ECI) অন্দরের অচলাবস্থা। সম্প্রতি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে, বিগত দশ মাসে কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন বাকি দুই নির্বাচন কমিশনার। তাঁদের অন্ধকারে রেখেই একাধিক নীতি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে অভিযোগ। ভোটার তালিকায় নতুন নাম তোলার ক্ষেত্রে নিয়মের বদল (Form 6) থেকে শুরু করে ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ, বহু বিষয়েই মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের একক আধিপত্যের বিরুদ্ধে আপত্তি ওঠে। এই স্বশাসিত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসতেই বিরোধী শিবির তো বটেই, সরব হয়েছে একাধিক নাগরিক ও রাজনৈতিক সংগঠন।


১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ

বিরোধীদের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ ভোটার তালিকা সংক্রান্ত। নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (Special Intensive Revision বা SIR) প্রক্রিয়ার তিনটি ধাপে দেশজুড়ে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি। সিজেপি-র হিসেব অনুযায়ী, এই সংখ্যাটি মোট ভোটারের প্রায় ১৪ শতাংশ। গোটা দেশের নিরিখে চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে শাসক ও বিরোধী জোটের মধ্যে সার্বিক ভোটের ব্যবধান যেখানে ছিল অত্যন্ত সামান্য, সেখানে এত বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার ঘটনা নির্বাচনী ফলাফল প্রভাবিত করেছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। যদিও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে মতপার্থক্যের অভিযোগ খারিজ করে দাবি করা হয়েছে যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়, কিন্তু সেই যুক্তিতে আশ্বস্ত হতে পারছেন না কেউই।

বিকল্প রণকৌশল

গান্ধী জয়ন্তীতে শিবাজি পার্কে প্রস্তাবিত প্রতিবাদের জন্য আগেই আবেদন করেছিল সিজেপি। তবে বোম্বে হাই কোর্টের (Bombay High Court) পুরনো নির্দেশিকা, যানজট এবং শব্দদূষণের যুক্তি দেখিয়ে মুম্বাই পুলিশ সেখানে সমাবেশের অনুমতি খারিজ করে দেয়। কিন্তু পিছু হটতে নারাজ উদ্যোক্তারা। অনুমতি না মেলা সত্ত্বেও শিবাজি পার্ক থেকেই অহিংস ‘জেল ভরো’ কর্মসূচি শুরুর সিদ্ধান্তে অনড় সংগঠন। আন্দোলনকারীদের বার্তা দেওয়া হয়েছে, কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতীক বা দলীয় পতাকা ছাড়াই জাতীয় পতাকা হাতে এই প্রতিবাদে অংশ নিতে। তরুণ প্রজন্মকে বার্তা দিয়ে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, ক্ষমতার একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁদের প্রতিবাদের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হবে ব্যঙ্গ, রসিকতা এবং সামাজিক মাধ্যমের মিম (Memes)।

মুম্বাই থেকে কলকাতা

এই আন্দোলন কেবল মহারাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। মুম্বাইয়ে শুরুর পরই আন্দোলনের পরিধি ছড়াতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ ও কর্নাটকের মতো রাজ্যগুলিতে। কলকাতায় এই কর্মসূচি পৌঁছলে রাজ্যের রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। এদিকে মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতেও এই ইস্যু নয়া মোড় নিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সামগ্রিক ভূমিকার বিরুদ্ধে আগেই যৌথ প্রতিবাদের ডাক দিয়েছেন উদ্ধব ঠাকরে ও রাজ ঠাকরে। মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনার (MNS) প্রধান রাজ ঠাকরে ইতিমধ্যেই সিজেপির এই ‘জেল ভরো’ আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। যদিও আন্দোলনকারী সংগঠনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, তারা কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের মঞ্চ কিংবা বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ ব্লকের (INDIA bloc) যৌথ প্রতিবাদের অংশ হিসেবে নয়, বরং সম্পূর্ণ স্বাধীন অবস্থান থেকেই গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাবে।