মধ্যপ্রদেশের পান্নায় ফের শুরু হয়েছে ‘চিতা আন্দোলন’। কেন-বেতোয়া নদী সংযোগ প্রকল্পের জন্য উচ্ছেদ ও জলমগ্ন হয়ে পড়া গ্রামগুলির মহিলারা স্থানীয় নদী, পুকুর-সহ বিভিন্ন জলাশয়ে ভাসমান চিতা তৈরি করে তার উপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুয়ে প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, প্রশাসন ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিলেও প্রতিশ্রুত টাকা এখনও মেলেনি। উপরন্তু গ্রামে পুলিশি অভিযান বেড়েছে।
গত জুলাইয়েও মূলত আদিবাসী মহিলাদের নেতৃত্বে এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল। প্রায় ১৫ দিনব্যাপী আন্দোলনের পর প্রশাসনের আশ্বাসে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলিকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের অভিযোগ, সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। সাড়ে ১২ লক্ষ টাকার প্যাকেজের কথা বলা হলেও বহু পরিবার মাত্র ৫ লক্ষ টাকা পেয়েছে।
প্রতিবাদে যাঁরা অংশ নিয়েছেন তাঁদের বক্তব্য, ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি গ্রাম জলমগ্ন। মান্ডালিয়া, তাপারিয়া ও কুয়রপুরের মতো গ্রামের বাড়িগুলিতে দুই থেকে তিন ফুট পর্যন্ত জল। বৃষ্টির পরে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ফলে ঘরবাড়ি ছেড়ে যাওয়ার মতো সুযোগও অনেক পরিবার পায়নি বলে আন্দোলনকারীদের দাবি।
এই আন্দোলনের মধ্যেই বুধবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে জয় কিষাণ সংগঠনের নেতা ও আন্দোলনকর্মী অমিত ভাটনগরকে। তিনি গত চার দিন ধরে অনশন করছিলেন। গ্রেপ্তারের আগে তাঁর অভিযোগ, আন্দোলন দমন করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে। আরও অভিযোগ, সাদা পোশাকে পুলিশকর্মীরা গ্রামে ঢুকে মহিলাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন এবং কয়েকজনের মোবাইল ফোনও নিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাঁর।
ভাটনগরের কথায়, ‘গণতন্ত্রকে হত্যা করা হচ্ছে বলে আমি স্বেচ্ছায় গ্রেপ্তার বরণ করছি। আমাদের কি শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করারও অধিকার নেই?’ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে প্রশাসনের নির্ধারিত শর্ত নিয়েও আপত্তি রয়েছে আন্দোলনকারীদের। তাঁদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট কাট-অফ তারিখের কারণে অনেক আদিবাসী পরিবার ক্ষতিপূরণ থেকে বাদ পড়ছে।
ভাটনগরের দাবি, তাঁরা উন্নয়ন প্রকল্পের বিরোধী নন। কিন্তু উন্নয়নের জন্য যেন আদিবাসীদের অধিকার ও জীবন-জীবিকা বিসর্জন দিতে না হয়। কেন-বেতোয়া নদী সংযোগ প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ পান্নার মাঝগাঁও বাঁধ প্রকল্প। কেন নদীর উদ্বৃত্ত জল দৌধন বাঁধ, সুড়ঙ্গ এবং প্রায় ২২১ কিলোমিটার দীর্ঘ খালের মাধ্যমে বেতোয়া নদীতে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের বক্তব্য, এর ফলে মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশের খরাপ্রবণ বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলে জলের সমস্যা কমবে। কৃষিকাজেও সুবিধা হবে এবং ভূগর্ভস্থ জলের জোগানও বাড়বে। অন্যদিকে, পান্নার গ্রামবাসীদের আশঙ্কা, কেন নদীর জল অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হলে গরমের সময়ে স্থানীয় এলাকায় জলসঙ্কট আরও বাড়বে। প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ ও বাস্তুচ্যুতি নিয়েও তাঁদের আপত্তি রয়েছে। ভারতে পরিবেশ ও জীবিকা রক্ষার আন্দোলনে মহিলাদের ভূমিকার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
আরও পড়ুন: ফ্রিজই থাকল তৃণমূলের ৪ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, আর্জি খারিজ সুপ্রিম কোর্টে
উত্তরাখণ্ডের চিপকো আন্দোলনে মহিলারা গাছ জড়িয়ে ধরে বন রক্ষার দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন। মধ্যপ্রদেশের নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনেও আদিবাসী মহিলাদের বড় ভূমিকা ছিল। সেই ধারাতেই পান্নার ‘চিতা আন্দোলন’—জল, জমি ও জীবিকার দাবিতে এক প্রতীকী প্রতিবাদ।