বাংলায় চলছে বিশেষ নিবিড় প্রক্রিয়া। এসআইআর-এর প্রক্রিয়াগত ত্রুটি নিয়ে প্রথম থেকেই সরব মুখ্যমন্ত্রী-সহ তৃণমূল কংগ্রেস। এ নিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠিও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। গত শনিবার ষষ্ঠ চিঠি দেন। তারপর রবিবার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে দেখা করার জন্য দিল্লি রওনা দেন। মমতার সঙ্গে রয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এসআইআর ক্ষতিগ্রস্তদের একাংশ। ক্ষতিগ্রস্তরা দিল্লির বঙ্গভবনে রয়েছেন। সোমবার সকাল থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজধানীর রাজনীতি।
অভিযোগ সোমবার সকালে আচমকাই চাণক্যপুরী ও হেইলি রোডের বঙ্গভবন ঘিরে ফেলে দিল্লি পুলিশ। তারপর ঘরে ঘরে চলে তল্লাশি। এই খবর পেয়েই কার্যত ‘এক কাপড়ে’ বঙ্গভবনের সামনে হাজির হন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দিল্লি পুলিশের আচরণের প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন তিনি। গোটা ঘটনার পিছনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-র হাত রয়েছে বলে ক্ষোভ উগরে দেন তিনি। মমতার প্রতিবাদে কার্যত ব্যর্থ হয়ে যায় ‘শাহী ষড়যন্ত্র’। মমতার জন্য অবশেষে পিছু হটে অমিত শাহ-র পুলিশ। দিল্লি পুলিশ বঙ্গভবন ছাড়ে বলে খবর। এদিন বঙ্গভবনের সামনে দিল্লি পুলিশের সঙ্গে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েছিলেন তৃণমূলের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারও।
মমতা দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে অতিসক্রিয়তার অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে বঙ্গভবন কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশ দিয়ে ভর্তি করে দিল। ঘরে ঘরে তল্লাশি চালাচ্ছে। এটা দিল্লি পুলিশ করতে পারে না। ওদের এক্তিয়ার নেই। এসআইআরের জন্য মৃতদের পরিবারের লোকজন আমাদের সঙ্গে এসেছেন। তাঁরা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সুর চড়াতে এখানে এসেছেন। আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ করছি এগুলি দেখতে। আপনি বাংলায় এলে রেড কার্পেট পেতে রাখি। আর আমরা দিল্লিতে আসলে কালো কার্পেট?’ এরপরই অমিত শাহকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে তিনি ‘এক কাপড়ে’ বঙ্গভবনের উদ্দেশে রওনা দেন। কিছুক্ষণের মধ্যে চাণক্যপুরীর বঙ্গভবনে পৌঁছোন তিনি। সঙ্গী অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। পুলিশের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়েন তিনি।
জীবিত হলেও নির্বাচন কমিশনের খাতায় ‘মৃত’, এমন ৫০ জন ভোটারকে দিল্লিতে নিয়ে গিয়েছে তৃণমূল। এ ছাড়া, নিয়ে যাওয়া হয়েছে আরও ৫০ জনকে যাঁদের পরিবারের কোনও না কোনও সদস্য ‘এসআইআর-এর কারণে’ মারা গিয়েছেন। চাণক্যপুরীর বঙ্গভবনে থাকা এসআইআর ‘আতঙ্কে’ স্বজনহারাদের সঙ্গে দেখা করেন মমতা। কারও কোনও সমস্যা হচ্ছে কি না তা নিয়ে খোঁজ খবরও নেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘চিন্তা করবেন না। আমি আছি।‘ সোম এবং মঙ্গলবার দু’দিনের নির্দিষ্ট কর্মসূচিতে কোনও পরিবর্তন হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন তৃণমূল নেত্রী। কেউ কোনও অসহযোগিতার শিকার হলে তা সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে জানানোর কথাও বলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এরপর হেইলি রোডের বঙ্গভবনে গেলে ফের একবার পুলিশের সঙ্গে মমতার বচসা বাধে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমাকে কি দেখাচ্ছেন, কীভাবে বঙ্গভবন ঘিরে রেখেছে দিল্লি পুলিশ তা দেখান।‘ সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরা সেদিকে ঘুরে যায়। আর তা দেখে যেন কিছুটা পিছু হঠে দিল্লি পুলিশ। এরপর ফের দিল্লি পুলিশকে আক্রমণ করে মমতা বলেন, ‘বঙ্গভবন ঘিরেছে। বাস নিয়ে এসেছে দিল্লি পুলিশ। দিল্লি পুলিশকে কোনও দোষ দেব না। যে মাথায় রয়েছে দোষ তাঁর। বাংলার দুর্নাম করছে। আর এসআইআর-এর নামে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিচ্ছে। দেশে স্বৈরাচারী সরকার চলছে। আমাকে দুর্বল ভাবার কোনও কারণ নেই। দিল্লিতে গরিব মানুষদের কোনও জায়গা নেই।‘
বঙ্গভবনের পাশাপাশি এদিন সংসদের ভিতরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সংসদে সরব হন সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার কার্যত দিল্লিকে ভিতর ও বাইরে ঘিরে ধরার কৌশল নেন শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। বাজেট অধিবেশন চলছে লোকসভায়। সেখানে উপস্থিত হন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। নিজের আসনে বসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বক্তৃতা দিতে ওঠেন বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। ঠিক সেই মুহূর্তে আচমকা পরিস্থিতি উত্তাল করে তোলেন শ্রীরামপুরের তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
ওয়েলে নেমে ধিক্কার স্লোগান দেন তিনি। আর তা থেকে কয়েক হাত দূরেই বসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎপর হন লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লা। তিনি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিজের আসনে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। মিনিট কয়েকের মধ্যেই উত্তেজনা প্রশমিত হয়। তার পরেই বক্তৃতা শুরু করেন রাহুল গান্ধী।
এদিকে সোমবার রাতেই রাজধানীতে রওনা হয়েছে রাজ্য পুলিশের বিশেষ দল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরাপত্তা আরও জোরদার করতেই এই পদক্ষেপ বলে খবর।নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, এদিন দিল্লিতে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, সে কথা মাথায় রেখেই মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রাজ্য পুলিশের শীর্ষকর্তারা। সেই মতো সন্ধ্যায় সিদ্ধান্ত হয়, রাতেই দিল্লি পাঠানো হবে রাজ্য পুলিশের ২২ জনের একটি দলকে। দলের শীর্ষে থাকছেন ডিএসপি পদমর্যাদার অফিসার। এছাড়াও অন্যান্য পদমর্যাদার অফিসার ও কনস্টেবলও থাকছে। থাকছেন মহিলা পুলিশও। সূত্রের খবর, মঙ্গলবার সকাল থেকে সেখানে থাকা রাজ্য পুলিশের বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেবেন তাঁরা। পাশাপাশি বঙ্গভবনের নিরাপত্তাও সুনিশ্চিত করতে চায় রাজ্য পুলিশ।