মহিলা সংরক্ষণ আইন কার্যকর করা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই জল্পনা চলছিল। এবার সেই জল্পনার অবসান হতে চলেছে। এ বিষয়ে আর দেরি করতে চাইছে না নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার। খুব দ্রুত আইন প্রণয়নের পথে হাঁটতে চাইছে বলে খবর।
২০২৩ সালে পাশ হওয়া এই আইন অনুযায়ী, লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভাগুলিতে মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। তবে বর্তমান আইন অনুযায়ী, নতুন জনসুমারি এবং তার পরবর্তী সীমানা পুনর্নির্ধারণ (ডিলিমিটেশন) প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হলে এই সংরক্ষণ কার্যকর করা সম্ভব নয়। এই লম্বা প্রক্রিয়া এড়াতে কেন্দ্র ২০১১ সালের পুরনো জনসুমারির তথ্য ব্যবহার করেই এগোতে চাইছে বলে খবর।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে লোকসভার গঠনেও বড়সড় পরিবর্তন হবে। বর্তমানে ৫৪৩টি লোকসভার আসন একলাফে বেড়ে ৮১৬টি আসনে পৌঁছে যাবে। যার মধ্যে প্রায় ২৭৩টি আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। ফলে দেশের আইনসভায় নারীদের প্রতিনিধিত্ব এক ধাক্কায় অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে।
আইনগত দিক থেকে এই প্রক্রিয়া মোটেই সহজ নয়। বর্তমান আইনের ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, নতুন জনসুমারি সম্পন্ন হওয়ার পর এবং তার ভিত্তিতে সীমানা পুনর্নির্ধারণ (ডিলিমিটেশন) শেষ হলেই কেবল মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর করা যাবে। ফলে সেই নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ না করে আইন বাস্তবায়ন করতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এই বাধা কাটাতে কেন্দ্রীয় সরকার চলতি বাজেট অধিবেশনেই একটি সংশোধনী বিল আনতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সেই বিলের মাধ্যমে আইন শিথিল বা পরিবর্তন করে দ্রুত সংরক্ষণ কার্যকর করার পথ তৈরি করার চেষ্টা হতে পারে।
তবে এখানেই রয়েছে আরও বড় সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জ। ভারতের সংবিধানের ৩৬৮(২) অনুচ্ছেদ মেনে, এই ধরনের পরিবর্তন আনতে হলে সংসদের দুই কক্ষেই বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ, উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন ছাড়া এই সংশোধনী পাস করানো সম্ভব নয়। লোকসভায় ২৪০ এবং রাজ্যসভায় ১০৩ জন সাংসদ নিয়ে বিজেপির একার পক্ষে এই লক্ষ্য পেরোনো সম্ভব নয়। তাই তলে তলে বিরোধী দলগুলির সঙ্গে শাসক শিবির যোগাযোগ রাখছে বলে খবর।
সূত্রের খবর, মন্ত্রীসভার অনুমোদন মিললে আগামী সপ্তাহেই প্রস্তাবিত বিলটি প্রথমে রাজ্যসভায় পেশ করা হতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লোকসভা নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে মহিলাদের প্রতিনিধিত্বকে সামনে রেখে বড় রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে মোদী সরকার । একে অনেকেই কৌশলগত ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হিসেবেও দেখছেন।
অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরও এই ইস্যুতে সক্রিয়। সম্প্রতি কংগ্রেস নেতা মল্লিকার্জু খাড়গে সংসদীয় মন্ত্রী কিরণ রিজিজুকে চিঠি লিখে মহিলা সংরক্ষণ আইন কার্যকর করার একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরির জন্য সর্বদলীয় বৈঠকের দাবি জানিয়েছেন। সেই প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠছে—বিরোধীদের দাবিকেই কি এবার কৌশলে কাজে লাগাতে চাইছে কেন্দ্র?
রাজনৈতিক মহলে এখন জোর জল্পনা, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে কেন্দ্র একদিকে যেমন নারীদের বৃহত্তর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে চাইছে, তেমনই অন্যদিকে বিরোধীদেরও চাপে রাখতে চাইছে। সব মিলিয়ে রাজধানীর রাজনৈতিক অন্দরে মহিলা সংরক্ষণ আইন নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। দেশের রাজনীতিতে নারীশক্তির অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘোরানো পদক্ষেপ হতে চলেছে।