ভালো পরীক্ষা দিয়েও প্রত্যাশা মতো নম্বর না পেয়ে উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করেছিলেন দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়া বেদান্ত শ্রীবাস্তব। কিন্তু বোর্ডের পাঠানো স্ক্যান কপি দেখে হতবাক হয়ে যায় তাঁর পরিবার। পদার্থবিদ্যার যে উত্তরপত্রটি পাঠানো হয়েছিল, সেটি যে তাঁর নয় তা হাতের লেখা দেখেই বুঝতে পারেন বেদান্ত। এই অভিযোগ সামনে আসতেই সিবিএসইর অন-স্ক্রিন মার্কিং বা ওএসএম পদ্ধতি নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
দিল্লির বাসিন্দা বেদান্ত সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে জানান, পদার্থবিদ্যায় অস্বাভাবিক কম নম্বর পাওয়ার পরে তিনি উত্তরপত্রের কপি দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বোর্ডের দেওয়া উত্তরপত্রের সঙ্গে তাঁর হাতের লেখার কোনও মিল ছিল না। পরিবারের সদস্য, শিক্ষক এমনকি পরিচিতরাও বিষয়টি নিশ্চিত করেন। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর পোস্টটি ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর বহু পড়ুয়ার একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা সামনে আসতে শুরু করে।
বোর্ড সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি বছর প্রায় ৯৮ লক্ষ উত্তরপত্র ডিজিটাল পদ্ধতিতে স্ক্যান করা হয়েছিল। তার মধ্যে প্রথমে প্রায় ৬৮ হাজার খাতায় স্ক্যানিং সংক্রান্ত সমস্যা ধরা পড়ে। পরে যাচাই করে দেখা যায়, প্রকৃত সমস্যা রয়েছে প্রায় ১৩ হাজার খাতায়। সিবিএসই-র দাবি, অনেক পরীক্ষার্থী হালকা কালির কলম ব্যবহার করায় স্ক্যানিংয়ে সমস্যা হয়েছে।
তবে অভিযোগ শুধু স্ক্যানিং নিয়েই নয়। ফল প্রকাশের পর থেকে খাতার প্রতিলিপি দেখতে গিয়ে নানান প্রযুক্তিগত সমস্যার মুখে পড়েছেন পড়ুয়ারা। কেউ রেজিস্ট্রেশন করতে পারেননি, কারও লগ-ইন হয়নি, আবার অনেকের ক্ষেত্রে ‘ভেরিফিকেশন অ্যান্ড স্ক্যানড কপি’ উইন্ডোই খোলেনি। বোর্ড পরে যান্ত্রিক ত্রুটির কথা স্বীকার করে এবং আবেদনের সময়সীমা বাড়িয়ে ২৫ মে রাত ১২টা পর্যন্ত করে।
বহু পড়ুয়ার অভিযোগ, আবেদন ফি কেটে নেওয়া হলেও প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে তাঁরা খাতার কপি দেখতে পারেননি। পরে সিবিএসই আশ্বাস দেয়, অতিরিক্ত কাটা টাকা ফেরত দেওয়া হবে। এই প্রক্রিয়ায় সাহায্যের জন্য স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া, ব্যাঙ্ক অফ বরোদা, কানাড়া ব্যাঙ্ক এবং ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্ককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রের খবর। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এবং অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন এই বিষয়ে বৈঠকও করেছেন।
এই ঘটনার জেরে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। বেদান্তের অভিযোগ, ভাইরাল হওয়ার পর সমাজমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে ট্রোলিং শুরু হয়। কিছু অ্যাকাউন্ট থেকে তাঁকে ‘দেশবিরোধী’ ও ‘পাকিস্তানি’ বলেও কটাক্ষ করা হয়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সমাজমাধ্যমে কেন্দ্রকে নিশানা করে লেখেন, সিবিএসইর মতো প্রতিষ্ঠানকেও ‘দুর্নীতির প্রতীক’ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এক ছাত্র নম্বর নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই বিজেপির আইটি সেল তাকে ‘দেশবিরোধী’ তকমা দিচ্ছে। এরপর তিনি লেখেন, ‘মোদীজি শুনে রাখুন, এই জেন জি-র তরুণরাই আপনার অহংকার ভাঙবে।’
বিতর্ক বাড়তেই মুখ খুলতে বাধ্য হয় সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন। বোর্ড প্রথমে জানায়, অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পরে তারা স্বীকার করে নেয় যে উত্তরপত্র পাঠানোর ক্ষেত্রে গাফিলতি হয়েছিল। বেদান্তকে সঠিক উত্তরপত্র পাঠানো হয়েছে এবং নম্বর সংশোধনের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে বোর্ড জানায়। আরও ২ জন পড়ুয়ার নম্বর সংশোধনের কথাও বলা হয়েছে।
তবে প্রশ্ন উঠছে, একই সমস্যার অভিযোগ করা বাকি পড়ুয়াদের কী হবে ? অনেকেই দাবি করছেন, ওএসএম পদ্ধতিতে উত্তরপত্র অদলবদল বা ভুল মূল্যায়নের সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে। বেদান্তের দাদা সিদ্ধান্ত শ্রীবাস্তব জানিয়েছেন, তাঁদের অভিযোগের পরে বহু পড়ুয়া একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে যোগাযোগ করছেন। তাঁর দাবি, সিবিএসই-র উচিত দ্রুত একটি নির্দিষ্ট অভিযোগ জানানোর পোর্টাল চালু করা।
প্রসঙ্গত, চলতি বছর থেকেই সিবিএসই পরীক্ষায় অন-স্ক্রিন মার্কিং পদ্ধতি চালু হয়েছে। গত সাত বছরের তুলনায় এ বার ফল খারাপ হওয়া এবং পুনর্মূল্যায়নে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসায় বোর্ডের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়েই বড় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
চলতি বছরে সিবিএসইর দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় প্রায় ১৭.৮ লক্ষ পরীক্ষার্থী নাম নথিভুক্ত করেছিলেন। তার মধ্যে ১৫ লক্ষের বেশি পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন। তবে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ঘিরে একের পর এক অভিযোগে পড়ুয়া ও অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি নিট-ইউজি পরীক্ষাকে ঘিরে প্রশ্নফাঁস বিতর্কের পর, সিবিএসইর এই গাফিলতি দেশের পরীক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিল।