বারামতী বিমানবন্দরের কাছে অবতরণের সময় অজিত পাওয়ার-সহ ৫ জনকে নিয়ে ভেঙে পড়ে লিয়ারজেট ৪৫ মডেল-এর ‘ভিটি-এসএসকে’ বিমানটি। এই বিমান দুর্ঘটনার তদন্তে নেমেছে এয়ারক্র্যাফ্ট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো অর্থাত এএআইবি এবং ডিজিসিএ। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে কোনও একক নিশ্চিত কারণ এখনও বলা যায়নি। তবে বেশ কিছু সম্ভাব্য কারণ তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই বিমান বম্বার্ডিয়ার এরোস্পেস সংস্থার তৈরি।
বারামতীতে আছড়ে পড়ার আগে ঠিক কী ঘটেছিল মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ারের বিমানে সেই তথ্য প্রকাশ্যে এনেছে কেন্দ্র। পাইলটের কিছু কথোপকথনও প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক। সেখানে পাইলটের সঙ্গে ‘এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল’ অর্থাত এটিসি-র শেষ মুহূর্তের কথোপকথন প্রকাশ্যে আনা হয়েছে। ককপিট থেকে এটিসি-কে বলা হয়, তাঁরা রানওয়ে দেখতে পাচ্ছেন না। পরে অবশ্য পাইলটেরা জানান, রানওয়ে দেখা গিয়েছে। যদিও শেষ পর্যন্ত বিমানটি ভেঙে পড়ে।
আকাশে ওড়ার ঠিক ৩৩ মিনিট পর ভেঙে পড়ে অজিত পাওয়ারের বিমান।বিমানের গতিবিধি নজরদারি সংস্থার তথ্যে জানা গিয়েছে, ওড়ার ২৪ মিনিটের মাথায় অজিতের বিমানটি আচমকা সঙ্কেত পাঠানো বন্ধ করে দেয়।কয়েক মিনিটের মধ্যে অবশ্য ফের সঙ্কেত পাঠানো শুরু হয়েছিল ওই বিমান থেকে। কেন্দ্রের প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, সকাল ৮টা ১৮ মিনিটে বিমানটি প্রথম যোগাযোগ করে বারামতীতে। দ্বিতীয়বার যোগাযোগ করে বারামতী থেকে ৩০ নটিক্যাল মাইল দূরে। তখন পাইলটকে বলা হয়েছিল বিমানের দৃশ্যমানতা বিবেচনা করে নীচের দিকে নামার জন্য। শুধুমাত্র যন্ত্রের উপর নির্ভর না করে পাইলট নিজে বিমানের বাইরে তাকিয়ে দৃশ্যমানতা এবং মেঘমুক্ত পরিস্থিতি বুঝে যাতে সিদ্ধান্ত নেন, সেটাই এটিসি-র তরফে বলা হয়।
এরপর পাইলট জানতে চান বাইরে হাওয়ার গতিবেগ কেমন রয়েছে। দৃশ্যমানতা কেমন রয়েছে, তা-ও জানতে চান তিনি। তাঁকে বলা হয়, বাতাস স্বাভাবিক রয়েছে। দৃশ্যমানতাও প্রায় ৩ হাজার মিটার বলে জানানো হয়। কেন্দ্র জানিয়েছে, এর পরে বারামতী বিমানবন্দরের ১১ নম্বর রানওয়েতে অবতরণ করার চেষ্টা করে বিমানটি। কিন্তু পাইলটেরা রানওয়ে দেখতে পাচ্ছিলেন না। সেই কারণে তাঁরা বিমানটিকে আকাশে একটি চক্কর কাটান।
তার পর আবার বিমানটি নামার চেষ্টা করে ১১ নম্বর রানওয়েতে। পাইলটেরা রানওয়ে দেখতে পাচ্ছেন কি না জানতে চাওয়া হয়। ককপিট থেকে উত্তর যায়, ‘রানওয়ে দেখা যাচ্ছে না। রানওয়ে দেখতে পেলে জানাচ্ছি।’ এর কয়েক সেকেন্ড পরেই ককপিট থেকে জানানো হয়, তাঁরা রানওয়ে দেখতে পেয়েছেন। কিন্তু ককপিট থেকে কোন পাইলট কথা বলছিলেন তা কেন্দ্রের প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ নেই ।
কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক জানাচ্ছে, সকাল ৮টা ৪৩ মিনিটে বিমানটিকে ১১ নম্বর রানওয়েতে অবতরণের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু তার পর কোনও উত্তর মেলেনি। এর পরই ৮টা ৪৪ মিনিটে ১১ নম্বর রানওয়ের ধারে আগুন দেখা যায়। রানওয়ের ধারে বিমানটি ভেঙে পড়ে। পরে কেন্দ্রীয় বিমানমন্ত্রী রামমোহন নায়ডু বলেন, ‘বিমানটি যে সময়ে অবতরণের চেষ্টা করছিল, হয়তো তখন দৃশ্যমানতা কম ছিল।’
বিমান দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দৃশ্যমানতা কম থাকার বিষয়টি যেমন উঠে আসছে, তেমনই প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে অবতরণের সময় নিয়ন্ত্রণ হারানোও দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে, বিশেষ করে রানওয়ের কাছে পৌঁছনোর সময় বিমানটি স্থিতিশীল ছিল না। ডিজিসিএ ব এএআইবি তদন্তে আলোচ্য বিষয়গুলির মধ্যে একেও অন্যতম সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিশ্লেষণ করে দেখছে।
তৃতীয়ত, বিমানের প্রযুক্তিগত কোনও ত্রুটি ছিল কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিমান পরিচালন সংস্থা ভিএসআর ভেঞ্চারস্ জানিয়েছে যে, বিমানটি ১০০ শতাংশ নিরাপদ এবং কোনওরকম প্রাথমিক প্রযু্ক্তিগত ত্রুটি তাদের জানা নেই। তবে ডিজিসিএ-র তদন্ত চলছে এবং এই বিষয়ে কোনও উপসংহারেও এখনও পর্যন্ত আসা হয়নি।
চতুর্থত, ষড়যন্ত্র বা অন্য কোনও কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটে এটি প্রমাণিত হয়নি বা সরকারিভাবেও দাবি করা হয়নি। দুর্ঘটনার তদন্তে বিমানটির ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার এবং ককপিট ভয়েস রেকর্ডার উদ্ধার করে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
বিমানের যাত্রাপথ পর্যবেক্ষণ ওয়েবসাইট ফ্লাইটরেডার ২৪’-এর তথ্য বলছে, বিমানটি আছড়ে পড়ার আগে একবার রানওয়েতে নামার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ব্যর্থ হওয়ার পরে আকাশে একবার চক্কর কেটে দ্বিতীয়বার চেষ্টা করেন পাইলট। দ্বিতীয় বার রানওয়েতে নামার সময়েই ভেঙে পড়ে বিমানটি। বারামতী বিমানবন্দরের ম্যানেজার শিবাজি তাওয়াড়ে জানান, অবতরণের সময়ে রানওয়ের একটি ধারে ভেঙে পড়ে লিয়ারজেট ৪৫। মাটিতে আছড়ে পড়তেই আগুন ধরে যায় বিমানটিতে।
এক প্রত্যক্ষদর্শীর কথায়, ‘বিমানটি যখন নেমে আসছিল, তখন দেখেই মনে হচ্ছিল ভেঙে পড়বে, এবং হয়ও তা-ই। তার পরই বিস্ফোরণ হয় এবং আগুন ধরে যায় বিমানে। পরে আরও চার-পাঁচটি বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পেয়েছি।’
বিমানটির ককপিটে ছিলেন ২ জন পাইলট। তাঁদের নাম কেন্দ্রের বিবৃতিতে প্রকাশ করা হয়নি। তবে জানা গিয়েছে, বিমানটির ক্যাপ্টেন (পাইলট-ইন-কমান্ড) ছিলেন সুমিত কুমার এবং ফার্স্ট অফিসার ছিলেন (সহ-পাইলট) শম্ভবী পাঠক। সুমিতের ১৫ হাজার ঘণ্টা উড়ানের অভিজ্ঞতা ছিল। শম্ভবীর ১৫০০ ঘণ্টা উড়ানের অভিজ্ঞতা ছিল।
লিয়ারজেট ৪৫ মডেলের বিমান আগেও দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল। ২০২৩-এর সেপ্টেম্বরে বিশাখাপত্তনম থেকে মুম্বইয়ের উদ্দেশে উড়ে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল একটি লিয়ারজেট ৪৫ বিমান। সেটিতেও অবতরণের সময়েই দুর্ঘটনা ঘটে। এই মডেলের বিমানগুলিতে ২ টি ইঞ্জিন থাকে। সাধারণভাবে এই জেট বিভিন্ন কর্পোরেট এবং ভিআইপি-দের সফরের জন্য ব্যবহার করা হয়। মাঝারি মাপের এই বিমান স্বল্প এবং মাঝারি দূরত্বের উড়ানের উপযুক্ত।