নালন্দার সমাবর্তনে জ্ঞান ও মানবিকতার বার্তা পি কে মিশ্রর

নালন্দায় পি কে মিশ্র।

‘শিক্ষা শুধুমাত্র জ্ঞান অর্জন বা পেশাগত দক্ষতা নয়, শিক্ষা হল বিচারবোধ, চরিত্র এবং নৈতিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার প্রক্রিয়া।’ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এমনই বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব পি কে মিশ্র। মঙ্গলবার বিহারের রাজগিরে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তিনি ১৪টি দেশের ২২১ জন স্নাতককে অভিনন্দন জানান।

সমাবর্তন মঞ্চ থেকে পি কে মিশ্র বলেন, বিশ্বের কিছু বিশ্ববিদ্যালয় শুধুমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবার কিছু বিশ্ববিদ্যালয় সভ্যতার প্রতীক। নালন্দা সেই দ্বিতীয় ধারার অন্তর্গত। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে প্রাচীন নালন্দা মহাবিহারের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং জ্ঞানের মুক্ত আদানপ্রদানের ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ।

তিনি বলেন, নালন্দার মূল দর্শন ছিল জ্ঞানকে সংলাপের মাধ্যমে বিস্তার করা, বিভিন্ন বিদ্যার মধ্যে সংযোগ গড়ে তোলা এবং মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে শিক্ষাকে কাজে লাগানো। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্বোধন করা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন পরিবেশবান্ধব পরিকাঠামোরও প্রশংসা করেন তিনি। একইসঙ্গে বুদ্ধগয়ার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ভগবান বুদ্ধের শিক্ষা যেমন সমগ্র এশিয়াকে প্রভাবিত করেছিল, তেমনই নালন্দার জ্ঞানচর্চাও ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে।


বর্তমান সময়ের প্রসঙ্গ টেনে পি কে মিশ্র বলেন, একবিংশ শতাব্দীতে কৃত্রিম মেধা, জীবপ্রযুক্তি এবং কোয়ান্টাম প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে মানুষের অসাধারণ অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু একইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং সামাজিক বিভাজনের মতো সংকটও বাড়ছে। তাঁর মতে, এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল— প্রযুক্তি ও তথ্যের সঙ্গে মানবিকতা, নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধকে কীভাবে যুক্ত রাখা যায়।

তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রযুক্তি দ্রুত উত্তর দিতে পারে। কিন্তু মানুষের যন্ত্রণা, মর্যাদা, নৈতিকতা বা জীবনের গভীর অর্থ বুঝতে পারে না। তাঁর কথায়, ‘সভ্যতার পতন তথ্য হারানোর কারণে হয় না, বরং স্বাধীন চিন্তা ও আত্মসমালোচনার ক্ষমতা হারানোর কারণেই হয়।’

নিজের বক্তব্যে উপনিবেশবাদের প্রভাবের কথাও উল্লেখ করেন পি কে মিশ্র। তিনি বলেন, ঔপনিবেশিক শাসন ভারতের প্রাচীন জ্ঞানব্যবস্থাকে পিছনে ঠেলে দিয়েছিল। আয়ুর্বেদ, বৌদ্ধ দর্শন এবং অর্থশাস্ত্রের মতো জ্ঞানচর্চাকে গুরুত্বহীন করে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর মতে, একবিংশ শতাব্দী হওয়া উচিত ‘বৌদ্ধিক উপনিবেশমুক্তির’ সময়। ভারতের উচিত নিজের জ্ঞান এবং চিন্তার ঐতিহ্যকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা। তিনি বলেন, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুনর্জাগরণ আসলে ভারতের সেই বিশ্বাসের প্রতীক, যেখানে মুক্তচিন্তা, বহুত্ববাদ, সংলাপ এবং অনুসন্ধানকে মানবতার ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য বলে মনে করা হয়।

এদিন জাতীয় শিক্ষানীতির বিভিন্ন দিকও তুলে ধরেন তিনি। বহুমাত্রিক শিক্ষা, মাতৃভাষাভিত্তিক পাঠদান এবং ভারতীয় জ্ঞানব্যবস্থাকে শিক্ষার মূলস্রোতে আনার বিষয়ে সরকারের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি ‘ভাষিণী’র মতো কৃত্রিম মেধাভিত্তিক ভাষান্তর প্রকল্প এবং ‘ওয়ান নেশন ওয়ান সাবস্ক্রিপশন’ প্রকল্পের কথাও বলেন, যার মাধ্যমে গবেষণাপত্রের সুযোগ আরও সহজলভ্য করা হচ্ছে।

কৃত্রিম মেধার প্রসঙ্গে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষা এবং পশ্চিমি তথ্যভান্ডারের উপর নির্ভর করে তৈরি কৃত্রিম মেধা এশিয়া বা বিশ্বের দক্ষিণ অংশের বাস্তব সমস্যাগুলিকে সঠিকভাবে বুঝতে পারবে না। ফলে প্রযুক্তি এবং বাস্তবতার মধ্যে বড় ফারাক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই কারণেই ‘ইন্ডিয়াএআই মিশন’-এর মতো উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন তিনি। তাঁর মতে, ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং জ্ঞানভিত্তিক সার্বভৌমত্ব গড়ে তোলা এখন অত্যন্ত জরুরি।

এদিনের এই সমাবর্তনে উপস্থিত ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে পি কে মিশ্র বলেন, ‘দেওয়ালের মধ্যে নিজেকে আটকে রেখো না। নালন্দার আসল শিক্ষা হল সারা বিশ্ব থেকে সেরা জিনিস গ্রহণ করা এবং মানবতার কল্যাণে আরও বড় কিছু ফিরিয়ে দেওয়া।’ শেষে তিনি হিতোপদেশ এবং তৈত্তিরীয় উপনিষদের উল্লেখ করে সত্য, ধর্ম এবং নিরন্তর শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিহারের রাজ্যপাল লেফটেন্যান্ট জেনারেল সৈয়দ আতা হাসনাইন, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সচিন চতুর্বেদী, বিদেশ মন্ত্রকের পূর্ব বিভাগের সচিব রুদ্রেন্দ্র ট্যান্ডন-সহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও শিক্ষাবিদরা।