যুদ্ধের আগুনেও ভারতমুখী ৬০ জাহাজ নিরাপদে হরমুজ পার, দেশে ফিরেছেন ৩,৯৭২ নাবিক 

Photo: Statesman

গত পাঁচ মাস ধরে চলছে আমেরিকা-ইরান সংঘাত। এবার পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতার মধ্যেও ভারতের জ্বালানি ও বাণিজ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখতে ধারাবাহিকভাবে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক তৎপরতা চালিয়েছে কেন্দ্র। যুদ্ধের মধ্যেও ভারতমুখী ৬০টি পণ্যবাহী জাহাজ নিরাপদে হরমুজ প্রণালী পার করেছে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে ৩ হাজার ৯৭২ জন ভারতীয় নাবিককে। বৃহস্পতিবার সংসদে এই তথ্য জানিয়ে গোটা অভিযানের খুঁটিনাটি তুলে ধরল কেন্দ্রীয় জাহাজ মন্ত্রক।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইরানের সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকেই পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। আলাপ আলোচনার মাধ্যমে অল্প কয়েকদিনের সংঘর্ষবিরতি হলেও পরে ফের হামলা ও পাল্টা হামলা শুরু হয়ে যায়। মার্কিন হামলার জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয়। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজের উপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার অভিযোগ ওঠে।

ভারতীয় নাবিক থাকা একাধিক জাহাজও হামলার মুখে পড়ে। হরমুজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১ ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু হয়। আহত হন আরও অনেকে। পরে কেন্দ্রের তরফে জানানো হয়, গোটা পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে এখনও পর্যন্ত ১৬ জন ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১০ জনই নাবিক। মৃত নাবিকদের পরিবারের হাতে ‘সিফেয়ারার্স ওয়েলফেয়ার ফান্ড সোসাইটি’-র মাধ্যমে ১০ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।


ভারতীয় নাবিকদের উপর হামলার ঘটনায় দিল্লি কড়া ভাষায় অসন্তোষ প্রকাশ করে। দিল্লিতে ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়। কারণ, তেহরানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় নাবিকবাহী জাহাজ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা কেন্দ্রের কাছে যথেষ্ট উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এই সঙ্কট মোকাবিলা করতে কেন্দ্র একাধিক পদক্ষেপ নেয়। জাহাজ মন্ত্রক একটি ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম চালু করে। সেখানে নাবিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ১৫ হজার ৭৭১টি ফোন এবং ৩৬ হাজার ৪৯৯টি ই-মেল আসে। প্রতিটি অভিযোগ ও সাহায্যের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়।

সেই সঙ্গে নাবিক এবং তাঁদের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলে কেন্দ্র। মানসিক চাপ কাটাতে ওয়েলফেয়ার কাউন্সেলর ও মনোবিদদেরও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। প্রয়োজনে তাঁরা নাবিক ও তাঁদের পরিবারকে পরামর্শও দেন। এছাড়া জরুরি পরিস্থিতিতে সাহায্যের জন্য মেরিটাইম কমিউনিকেশন সেন্টার বা এমএমডিএসি-কেও সর্বক্ষণ সক্রিয় রাখা হয়েছিল। শুধু উদ্ধারকাজ নয়, সতর্কতামূলক ব্যবস্থাও নেয় ভারত।

জাহাজ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ জানুয়ারি ইরানের ভারতীয় দূতাবাস প্রথম সতর্কবার্তা জারি করে। হরমুজ প্রণালী বা ইরানের বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজগুলিকে অতিরিক্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে আরও ৬ দফা নির্দেশিকা জারি করা হয়। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজে নতুন করে ভারতীয় নাবিক নিয়োগ না করার পরামর্শ দেওয়া হয় জাহাজ মালিকদের। এর ফলে বহু নাবিককে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

সেই সঙ্গে দিল্লি কূটনৈতিক স্তরেও সক্রিয় ছিল। আমেরিকা ও ইরান দু’দেশের সঙ্গেই ভারতের সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে ভারতমুখী জাহাজগুলির নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার চেষ্টা করে দিল্লি। নির্দিষ্ট সময় অন্তর জাহাজগুলির জন্য নৌ-পরামর্শ বা অ্যাডভাইজরি জারি করা হয়, যাতে তারা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে নিরাপদ পথ ধরে চলাচল করতে পারে।