ছত্তীসগড়ের বস্তার ডিভিশনে একসঙ্গে ৫১ জন মাওবাদীর আত্মসমর্পণ ঘিরে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে জঙ্গলমহল। নিরাপত্তা সূত্রে জানা গিয়েছে, আত্মসমর্পণকারীদের সম্মিলিত মাথার দাম ছিল ১ কোটি ৬১ লক্ষ টাকা। বিজাপুর জেলায় আত্মসমর্পণ করেছেন ৩০ জন, তাঁদের মধ্যে ২০ জন মহিলা। পাশাপাশি সুকমা জেলায় আত্মসমর্পণ করেছেন ২১ জন, যাঁদের মধ্যে ১৪ জন মহিলা রয়েছেন।
বস্তার রেঞ্জের আইজি সুন্দররাজ পত্তিলিঙ্গম জানিয়েছেন, ধারাবাহিক অভিযান, নিরাপত্তা শিবিরের বিস্তার, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক প্রকল্পের সুফল প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছে যাওয়ার ফলেই আত্মসমর্পণের প্রবণতা দ্রুত বেড়েছে। রাজ্য সরকারের ‘পুনা মার্গম’ পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় আত্মসমর্পণকারীদের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে। প্রশাসনের দাবি, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা—এই দুই কৌশল মিলিয়েই মাওবাদী সংগঠনের ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি মহারাষ্ট্রের গড়চিরোলিতে নিরাপত্তাবাহিনীর অভিযানে সাত জওয়ান নিহত হন। সেই ঘটনার পরপরই বস্তারে একযোগে ৫১ জনের আত্মসমর্পণকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। বৃহস্পতিবার ওড়িশাতেও ১৯ জন মাওবাদী আত্মসমর্পণ করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন রাজ্য কমিটির নেতা নিখিল ওরফে নিরঞ্জন রাউত এবং তাঁর স্ত্রী অঙ্কিতা ওরফে রশ্মিতা লেঙ্কা।
নিষিদ্ধ সংগঠন সিপিআই (মাওবাদী)-এর নেতা-কর্মীদের বারবার মূলস্রোতে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। প্রসঙ্গত, কেন্দ্র সরকার আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে দেশ থেকে মাওবাদ নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। একদিকে আত্মসমর্পণের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনই জোরদার হচ্ছে ধারাবাহিক অভিযানের তৎপরতা। গত মাসেই বিজাপুরে ৫২ জন মাওবাদী আত্মসমর্পণ করেছিলেন, যাঁদের মধ্যে ৪৯ জনের মাথার মোট দাম ছিল ১ কোটি ৪১ লক্ষ টাকা।
এই আত্মসমর্পণের ধারাবাহিকতার মধ্যেই বড় সাফল্য মিলেছে গরিয়াবন্দ জেলায়। আত্মসমর্পণ করা মাওবাদীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে জোরদার তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে নিরাপত্তাবাহিনী। পুলিশ সূত্রের খবর, জেলার ছ’টি আলাদা জায়গা থেকে এই উদ্ধার হয়েছে।
ওড়িশা সীমান্ত লাগোয়া মইপুর থানার অন্তর্গত ভালুডিগ্গি ও মেতাল পাহাড়ি এলাকায় টানা ৩৬ ঘণ্টা ধরে চিরুনি তল্লাশি চালায় পুলিশ, ডিস্ট্রিক্ট রিজার্ভ গার্ড এবং স্পেশ্যাল ই-৩০ ইউনিট। জঙ্গলের ভিতরে একাধিক গোপন আস্তানায় অভিযান চালিয়ে উদ্ধার হয়েছে ইনসাস রাইফেল, দেশি পিস্তল, ১২ বোরের বন্দুক, সিঙ্গল শট বন্দুক, ১২৭টি কার্তুজ, একাধিক ম্যাগাজিন, ২২টি শেল-সহ বিপুল বিস্ফোরক সামগ্রী।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, এই ছ’টি জায়গাই মাওবাদীদের অস্ত্র মজুত ও নির্মাণের ডেরা ছিল। ওই ডেরাগুলির দায়িত্বে থাকা তিন মাওবাদী সদস্য আগেই নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। গত দেড় বছর ধরে গরিয়াবন্দ জেলায় ‘অপারেশন বিরাট’ নামে বিশেষ মাওবাদীদমন অভিযান চলছে। পুলিশের দাবি, ওই এলাকার সক্রিয় মাওবাদীদের অধিকাংশই ২৬ জানুয়ারির আগেই আত্মসমর্পণ করেছেন।
নিরাপত্তা মহলের মতে, বস্তার ও গরিয়াবন্দে ধারাবাহিক আত্মসমর্পণ এবং অস্ত্র উদ্ধার—দুই মিলিয়ে মাওবাদীদের সাংগঠনিক শক্তি যে ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে, তা খুবই স্পষ্ট।