Explained: ২৫ জুন কেন সংবিধানের কালো দিন? কারণ, সেদিন রাতে গণতন্ত্রকে কারাবন্দি করা হয়েছিল

The emergency (The Statesman Archives)

পিছিয়ে যেতে হবে ৫১ বছর। সালটা ১৯৭৫। ২৫ জুন রাত্রি। ব্যস্ততার তুঙ্গ মুহূর্তে দিল্লির সংবাদপত্র দপ্তরগুলোতে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। ছাপার মেশিন থেমে যায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় জয়প্রকাশ নারায়ণ (Jayaprakash Narayan), মোরারজি দেশাই (Morarji Desai), অটলবিহারী বাজপেয়ী (Atal Bihari Vajpayee), লালকৃষ্ণ আদবানি (L.K. Advani)-সহ দেশের প্রায় সমস্ত বিরোধী নেতাকে। ভোরবেলা রেডিওতে ভেসে আসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর (Indira Gandhi) কণ্ঠস্বর। তিনি শান্তভাবে জানালেন, রাষ্ট্রপতি দেশে জরুরি অবস্থা (Emergency) জারি করেছেন। ঘাবড়ানোর কিছু নেই।

কিন্তু ঘাবড়ানোর তো অনেক কিছুই ছিল। কারণ, বলা নেই-কওয়া নেই সংবিধানের ৩৫৬ ধারা লাগু করলে গণতন্ত্রকে চিতায় তোলা হয়।

কেন এল এমন রাত


১৯৭১ সালে লোকসভা নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ইন্দিরা গান্ধী তখন ভারতীয় রাজনীতির শীর্ষে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে টলছিল ভিত। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, দুর্নীতি সব মিলিয়ে দেশজুড়ে অসন্তোষ। বিহার ও গুজরাটে ছাত্র আন্দোলনের আগুন জ্বলছিল। সেই আগুনে ঘি ঢাললেন গান্ধীযুগের মুক্তিযোদ্ধা জয়প্রকাশ নারায়ণ। তাঁর ডাক ছিল, সম্পূর্ণ ক্রান্তি (Sampoorna Kranti)।

তার পরই নেমে এল ভয়ংকর আঘাত।

১৯৭৫ সালের ১২ জুন এলাহাবাদ হাইকোর্টের (Allahabad High Court) বিচারপতি জগমোহনলাল সিনহা (Justice Jagmohanlal Sinha) রায় দিলেন, ১৯৭১ সালে রায়বেরেলি থেকে ইন্দিরার নির্বাচন অবৈধ। নির্বাচনী দুর্নীতি প্রমাণিত। ছয় বছর কোনও নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না তিনি।

সুপ্রিম কোর্ট শর্তসাপেক্ষে প্রধানমন্ত্রী থাকার অনুমতি দিল, কিন্তু সংসদে ভোট দেওয়ার অধিকার কেড়ে নিল। বিরোধীদের দাবি উঠল, এখনই পদত্যাগ করুন ইন্দিরা। রামলীলা ময়দানে (Ramlila Maidan) বিশাল জনসভায় জয়প্রকাশ নারায়ণ বললেন, সিংহাসন খালি করো, কারণ জনতা আসছে। ইন্দিরার সরকার এটিকে বিদ্রোহের উসকানি হিসেবে দেখল। সেই রাতেই তাই কঠোর দমনাত্মক পদক্ষেপ করা হল।

২১ মাসের অন্ধকার

জরুরি অবস্থা জারি করে কেড়ে নেওয়া হল দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার। প্রতিরোধমূলক আটক আইনে বিরোধী নেতাদের কারাবন্দি করা হল। হ্যাবিয়াস কর্পাস (Habeas Corpus)-এর মতো শতাব্দীপ্রাচীন আইনি সুরক্ষা তুলে নেওয়া হল। অল ইন্ডিয়া রেডিও ও দূরদর্শন পরিণত হল সরকারের একতরফা প্রচারমঞ্চে।

এখানেই শেষ হল না কলঙ্কের ব্যাপ্তি। সংবিধান সংশোধন করে আইনসভার ক্ষমতা বাড়ানো হল, বিচার বিভাগের কর্তৃত্ব ছেঁটে দেওয়া হল। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করার পথ বন্ধ করে দেওয়া হল ৩৯তম সাংবিধানিক সংশোধনীর (39th Amendment) মাধ্যমে। এর পর এল ৪২তম সংশোধনী (42nd Amendment), যা আদালতের বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার ক্ষমতাকেও সীমিত করে দিল।

ইন্দিরার পুত্র সঞ্জয় গান্ধী (Sanjay Gandhi) কোনও সরকারি পদে না থেকেও পক্ষান্তরে দেশ চালালেন। তাঁর নির্দেশে চলল জোর করে বন্ধ্যাকরণ (Forced Mass Sterilization) এবং দিল্লির বস্তি উচ্ছেদ। হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ভিটে হারালেন।

আর সংবাদমাধ্যম? কোনও আপসের পথে না হেঁটে দ্য স্টেটসম্যান (The Statesman) ছাপল রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’।  ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস (Indian Express) সম্পাদকীয় পাতা ফাঁকা রেখে প্রতিবাদ জানাল। যদিও শিরদাঁড়া বিকিয়ে অনেকেই সরাসরি মাথা নত করল। সেই সম্পর্কে আদবানির মন্তব্য আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছিলেন,  শুধু নতজানু হতে বলা হয়েছিল, কিন্তু কেউ কেউ হামাগুড়ি দিল।

গণতন্ত্রের জয়

১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে ইন্দিরা গান্ধী নির্বাচন ডাকলেন। ভুল হিসেব। ক্ষোভে ফুঁসতে থাকা জনতা সুযোগ পেয়ে রায় দিল। কংগ্রেস ধরাশায়ী। ইন্দিরা নিজেই রায়বেরেলিতে হারলেন। ৩০ বছরের কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটিয়ে প্রধানমন্ত্রী হলেন মোরারজি দেশাই। স্বাধীন ভারতের প্রথম অ-কংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী। মানুষের টুঁটি চিপে ধরেও পতন এড়াতে পারল না কংগ্রেস।

ব্যালটবাক্সে নিজেদের অধিকার ফেরানোর ডাক দিল জনতা। গণতন্ত্র স্বৈরাচারের রাহুগ্রাস থেকে নিজেকে রক্ষা করল।

৫০ বছর পরেও প্রতিরোধের পদধ্বনি

২০২৪ সালের জুলাই মাসে কেন্দ্রীয় সরকার গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ২৫ জুনকে ‘সংবিধান হত্যা দিবস (Samvidhan Hatya Diwas)’ হিসেবে ঘোষণা করে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জানান, এই দিনটি প্রতি বছর মনে করিয়ে দেবে কী হয় যখন সংবিধানকে পদদলিত করা হয়।

জরুরি অবস্থার ৫০তম বার্ষিকী স্মরণে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সারা দেশে অনুষ্ঠানমালা চলছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিতর্ক, প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা, তথ্যচিত্র প্রদর্শনী।

মোদী বলেছেন, সংসদের কণ্ঠ স্তব্ধ করা হয়েছিল, আদালতকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছিল, গরিব ও প্রান্তিক মানুষদের বিশেষভাবে নিশানা করা হয়েছিল। কিন্তু মানুষই প্রতিরোধ গড়েছিল।

ইতিহাসের বিচারে এ কথা অনস্বীকার্য,  ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন ছিল স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কিত রাত। একজন মানুষের দখলদারির কায়েমি স্বার্থ রক্ষা করতে দেশের কোটি কোটি মানুষের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। আদালতের রায়কে থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল সংবিধান সংশোধনের জোরে। সংবাদমাধ্যমের মুখ বন্ধ করা হয়েছিল ক্ষমতার নগ্ন প্রদর্শনে।

সেই রাতকে ভুলে গেলে দেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত থাকতে পারে না। বরং, মনে রাখুন। কারণ, মনে রাখলেই গণতন্ত্র থাকবে বেঁচেবর্তে। দ্য স্টেটসম্যানের মতোই দৃপ্ত। অনির্বাণ দীপশিখার মতো।