৮৮টি দেশ থেকে ছুটে আসছেন রোগীরা, হরিদ্বারের ‘ওয়েলনেস মডেল’ এখন বিশ্বজুড়ে চর্চার বিষয়

Patanjali Wellness Model (SNS)

ক্যালিফোর্নিয়া থেকে কলকাতা, তালিকাটা লম্বা। জীবনযাত্রাজনিত রোগ (lifestyle disease), দীর্ঘমেয়াদি অসুখ, কিংবা বার্ধক্যজনিত সমস্যায় জেরবার হয়ে দেশ-বিদেশের মানুষ এখন চোখ রাখছেন একটাই ঠিকানায়, পতঞ্জলি (Patanjali)। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক বছরে ১ কোটি ৩৮ লক্ষেরও বেশি রোগী পতঞ্জলির ওয়েলনেস মডেলে (wellness model) চিকিৎসা করিয়েছেন। এর মধ্যে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকা মিলিয়ে ৮৮টি দেশের প্রায় ৪৫ হাজার বিদেশি রোগীও রয়েছেন। আয়ুর্বেদ (Ayurveda) যে আর কেবল ঐতিহ্যের গণ্ডিতে বন্দি নেই, বরং বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে, এই সংখ্যাই তার বড় প্রমাণ।

পতঞ্জলির বৈদ্যুতিন মেডিক্যাল রেকর্ড (electronic medical record) অনুযায়ী, প্রতিটি রোগীর ডিজিটাল স্বাস্থ্য-তথ্য সংরক্ষিত থাকছে। আর এই বিশাল নেটওয়র্ক চালাচ্ছেন ৫ হাজারেরও বেশি চিকিৎসক এবং ৫০০ জনের বেশি বিজ্ঞানী। শুধু চিকিৎসা নয়, ১০ লক্ষাধিক যোগ স্বেচ্ছাসেবক এবং ১ লক্ষেরও বেশি বিনামূল্যের যোগ ক্লাসের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার মানুষ নিখরচায় বহির্বিভাগের (OPD) পরিষেবা পাচ্ছেন। এখনও পর্যন্ত পতঞ্জলি থেকে প্রকাশিত হয়েছে ৫০০-র বেশি গবেষণাপত্রও (research paper)।

আচার্য বালকৃষ্ণ ও যোগগুরু বাবা রামদেব (SNS)

আকর্ষণীয় বিষয় হল রোগীদের বৈচিত্র্য। ওয়েলনেস মডেলের মোট রোগীর ৫৭ শতাংশ পুরুষ, ৪৩ শতাংশ মহিলা। আর প্রায় ৪৬ শতাংশ রোগীর বয়স ৫০ বছরের বেশি। অর্থাৎ, প্রবীণ নাগরিকদের মধ্যে আয়ুর্বেদের প্রতি আস্থা ক্রমশ বাড়ছে। যদিও ৯৯.৭ শতাংশ রোগীই ভারতীয়, তবু বিদেশি রোগীর নিরবচ্ছিন্ন আনাগোনা প্রমাণ করছে, আয়ুর্বেদ এখন সীমান্ত পেরিয়ে বিশ্বজনীন হয়ে উঠছে।


কোন রাজ্য থেকে বেশি রোগী

দেশের প্রায় প্রতিটি রাজ্য থেকেই পতঞ্জলিতে চিকিৎসা করাতে যান মানুষ। তবে উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, বিহার, ঝাড়খণ্ড, গুজরাত, হরিয়ানা এবং মহারাষ্ট্র থেকে রোগীর সংখ্যা অন্য রাজ্যগুলির তুলনায় বহু গুণ বেশি। এখানেই একটা প্রশ্ন উঁকি দেয়, বাংলার রোগীরা কোথায়?

বাংলার নিজস্ব আয়ুর্বেদ ঐতিহ্য, তবু ফাঁক থেকে গিয়েছে অনেকটাই

আয়ুর্বেদের সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক নতুন নয়। কলকাতাতেই একাধিক পুরনো আয়ুর্বেদ প্রতিষ্ঠান রয়েছে, অষ্টাঙ্গ আয়ুর্বেদ বিদ্যালয়, বিশ্বনাথ আয়ুর্বেদ কলেজ কিংবা বৈদ্যশাস্ত্রপীঠের মতো নাম এখনও পুরনো কলকাতার চিকিৎসা-ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। কিন্তু আধুনিক পরিকাঠামো ও বিনিয়োগের নিরিখে বাংলা যে অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে, তা মানছেন আয়ুর্বেদ চিকিৎসকরাও।

চলতি বছরের মে মাসে রাজ্যের নতুন সরকার একটি স্বতন্ত্র আয়ুষ দপ্তর (AYUSH department) তৈরির ঘোষণা করেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, সারা দেশে আয়ুষ চিকিৎসার যে বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে রাজ্যকেও যুক্ত করাই লক্ষ্য। এই ঘোষণায় উচ্ছ্বসিত অখিল ভারতীয় আয়ুর্বেদ মহাসম্মেলনের রাজ্য সভাপতি তথা আয়ুর্বেদ চিকিৎসক ডা. সুমিত সুর জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন নতুন কলেজ তৈরি না হওয়ায় রাজ্যে আয়ুর্বেদ চিকিৎসকের চরম ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, অন্তত পাঁচটি নতুন আয়ুর্বেদ কলেজ এবং একটি কেন্দ্রীয় আয়ুর্বেদ প্রতিষ্ঠান তৈরি হলে তবেই এই ঘাটতি মিটবে। তাঁর আরও অভিযোগ, কেন্দ্রের জাতীয় আয়ুষ মিশনের (National AYUSH Mission) বিভিন্ন প্রকল্পে বরাদ্দ প্রায় ৩৩ কোটি টাকা ব্যবহারই করা যায়নি, ফলে তার সুফল থেকে বঞ্চিত থেকেছেন বাংলার মানুষ।

এই প্রেক্ষাপটে পতঞ্জলির মতো সংস্থার উপর বিপুল সংখ্যক রোগীর ভরসা এবং তাদের ডিজিটাল মেডিক্যাল রেকর্ড, গবেষণাভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতির অভিজ্ঞতা বাংলার নতুন আয়ুষ পরিকাঠামো তৈরিতে একটি সম্ভাব্য মডেল হয়ে উঠতে পারে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের একাংশের। জেলাস্তরে আয়ুষ হাসপাতাল ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র পর্যন্ত আয়ুর্বেদ পৌঁছে দেওয়ার যে লক্ষ্য রাজ্য সরকার স্থির করেছে, তাতে বৃহৎ পরিসরে সফল একটি ওয়েলনেস নেটওয়ার্কের অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।

Patanjal Wellness Model (SNS)

সংহত স্বাস্থ্য মডেল

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং আয়ুষ মন্ত্রকের যে ভাবনা, ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবার (universal health coverage) অন্যতম স্তম্ভ করে তোলা, পতঞ্জলির ওয়েলনেস মডেল অনেকটা সেই পথেই এগোচ্ছে বলে জানাচ্ছে সংস্থাটি। আচার্য বালকৃষ্ণের বক্তব্য, পতঞ্জলির লক্ষ্য কেবল রোগ নিরাময় নয়, বরং সময়ের কষ্টিপাথরে পরীক্ষিত0 আয়ুর্বেদকে বিশ্বের মূলস্রোতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত করা। ডিজিটাল রেকর্ড, নিবিড় গবেষণা আর আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনেই এই কাজ এগোচ্ছে বলে তাঁর দাবি।

অন্য দিকে যোগগুরু স্বামী রামদেবের বক্তব্য, যোগ, আয়ুর্বেদ, প্রকৃতিচিকিৎসা, সুষম আহার আর বিজ্ঞানসম্মত উপবাসভিত্তিক জীবনযাত্রা আজ কোটি কোটি মানুষের কাছে নতুন আশার নাম হয়ে উঠছে। যোগ ও আয়ুর্বেদকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে জুড়ে একটি সংহত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা (integrated health system) গড়ে তোলাই তাঁদের লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন তিনি।

 

নোট: এই প্রতিবেদনের তথ্য পতঞ্জলি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত পরিসংখ্যান ও বিবৃতির উপর ভিত্তি করে তৈরি। আয়ুর্বেদ বা কোনও বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণের আগে যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই শ্রেয়।