করোনা বা মাঙ্কিপক্সের স্মৃতি সম্পূর্ণ ফিকে হওয়ার আগেই বিশ্বজুড়ে নতুন করে থাবা বসাচ্ছে আর এক অতিমারির আতঙ্ক। আফ্রিকার বুকে ফের ভয়ঙ্কর ও প্রাণঘাতী রূপ ধারণ করেছে ইবোলা (Ebola) ভাইরাস। মধ্য আফ্রিকার দেশ ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গোয় (Democratic Republic of Congo) এই মারণ ভাইরাসের সংক্রমণে ইতিমধ্যেই মৃতের সংখ্যা ৪৩৮ ছাড়িয়ে গিয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যাও দেড় হাজারের দোরগোড়ায় (১৪০৬ জন)। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organization বা WHO)। এই আবহে সুদূর আফ্রিকা থেকে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কায় কলকাতা-সহ ভারতের সমস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জারি করা হয়েছে কড়া সতর্কতা।
হু হু করে বাড়ছে মৃত্যু, কপালে চিন্তার ভাঁজ বিশেষজ্ঞদের
কঙ্গোর জাতীয় জনস্বাস্থ্য দফতরের (National Institute of Public Health) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই প্রাদুর্ভাবে মৃত্যুর হার (Case Fatality Rate) প্রায় ৩১ শতাংশ, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। গত ১৫ মে কঙ্গো প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রাদুর্ভাবের কথা ঘোষণা করে।
সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় নেমে এসেছে দেশটির উত্তর-পূর্বের ইটুরি প্রদেশে (Ituri Province)। মোট মৃত্যুর প্রায় ৮৩ শতাংশই ঘটেছে এই এলাকায়। সেখান থেকেই এখন ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিবেশী নর্থ কিভু (North Kivu) এবং সাউথ কিভু (South Kivu) প্রদেশে।
প্রচলিত টিকায় কাজ হচ্ছে না
এ বারের সংক্রমণের নেপথ্যে রয়েছে ইবোলা ভাইরাসের একটি অত্যন্ত বিরল ও মারাত্মক প্রজাতি বান্ডিবুগিয়ো ভাইরাস (Bundibugyo Virus)। কঙ্গোর ইতিহাসে এটি সপ্তদশতম ইবোলা প্রাদুর্ভাব। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অতীতে ইবোলার জাইর প্রজাতির (Zaire Ebolavirus) জন্য যে প্রতিষেধক বা প্রচলিত টিকা তৈরি করা হয়েছিল, তা এই বিরল বান্ডিবুগিয়ো প্রজাতির বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র কার্যকর নয়।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করে গত ১৬ মে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই প্রাদুর্ভাবকে আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা (Public Health Emergency of International Concern বা PHEIC) হিসেবে ঘোষণা করেছে।
প্রত্যন্ত গ্রাম নয়, এবার বড় শহরে থাবা
সংক্রমণের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কঙ্গোর অন্যতম প্রধান বড় শহর কিসানগানিতে (Kisangani) প্রথম আক্রান্তের খোঁজ মেলায় চিকিৎসকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। প্রায় ১৫ লক্ষ জনবসতিপূর্ণ এই শহরটি সোপো প্রদেশের (Tshopo Province) প্রশাসনিক রাজধানী। ফলে সেখানে সংক্রমণ পৌঁছনোর অর্থ হলো তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা।
ইতিমধ্যেই প্রতিবেশী রাষ্ট্র উগান্ডাতেও (Uganda) এই ভাইরাস থাবা বসিয়েছে, সেখানে ২০ জন আক্রান্তের মধ্যে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মাঝেই যুক্ত হয়েছে স্থানীয় মানুষের কুসংস্কার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি অবিশ্বাস। এক এলাকায় মৃতদেহ সৎকার ঘিরে বিক্ষোভের জেরে একটি আস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, যেখানে ডিউটি করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন এক পুলিশকর্মীও।
ট্রায়ালে পরীক্ষামূলক ওষুধ?
আপাতত এই বান্ডিবুগিয়ো প্রজাতির জন্য বাজারে কোনও অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। তবে ডাব্লিউএইচও (WHO) জানিয়েছে, দুটি পরীক্ষামূলক চিকিৎসা পদ্ধতি— মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি এমবিপি১৩৪ (MBP134) এবং অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ রেমডেসিভির (Remdesivir)-এর ক্লিনিকাল ট্রায়াল (Clinical Trial) জরুরি ভিত্তিতে শুরু করা হয়েছে।
কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট ফেলিক্স চিসেকেদি (Felix Tshisekedi) এক সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, মহামারি কোনও ভৌগোলিক সীমান্ত মানে না। একই সুরে সুর মিলিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা (Cyril Ramaphosa) আন্তর্জাতিক মহলের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, কঙ্গোর উপর যেন কোনও অর্থনৈতিক বা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা (Travel Ban) চাপিয়ে দেশটিকে একঘরে করে না দেওয়া হয়।
দমদম বিমানবন্দরেও বিশেষ স্ক্রিনিং
ভারতে এখনও পর্যন্ত এই ভাইরাসের কোনও হদিস মেলেনি। তবে আগেভাগেই সুরক্ষাকবচ তৈরি করতে কোমর বেঁধে নেমেছে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক (Ministry of Health)। গত ২৩ মে একটি ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি (Travel Advisory) জারি করে নাগরিকদের কঙ্গো, উগান্ডা এবং দক্ষিণ সুদানে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি, ২৫ জুন থেকে দেশের সমস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশেষত, কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (Kolkata Airport)-সহ সমস্ত বড় এয়ারপোর্টে প্রত্যেক আন্তর্জাতিক যাত্রীর জন্য ‘এয়ার সুবিধা’ (Air Suvidha) পোর্টালের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ঘোষণাপত্র জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ইবোলা ভাইরাসের ‘ইনকিউবেশন পিরিয়ড’ বা শরীরে উপসর্গ প্রকাশের সর্বোচ্চ সময়সীমা ২১ দিন। তাই এই ফর্মে যাত্রীদের বিগত ২১ দিনের বিদেশ ভ্রমণের নিখুঁত ইতিহাস জানাতে হচ্ছে। বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্রিনিং (Thermal Screening) করার পাশাপাশি সন্দেহভাজনদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে বিশেষ আইসোলেশন ইউনিট (Isolation Unit)।
উপসর্গ চিনে রাখা জরুরি
সাধারণ মানুষের সতর্কতার জন্য চিকিৎসকেরা ইবোলার প্রাথমিক লক্ষণগুলি মনে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন:
- আচমকা তীব্র জ্বর ও অসহ্য মাথাযন্ত্রণা।
- গা-হাত-পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা এবং চরম দুর্বলতা।
- গলা ব্যথা, বমি এবং ডায়ারিয়ার লক্ষণ।
- রোগ বাড়াবাড়ি পর্যায়ে পৌঁছলে নাক, মুখ বা মলদ্বার দিয়ে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ (Hemorrhage)।
আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, লালা বা অন্য কোনও শারীরিক তরলের (Bodily fluids) সরাসরি সংস্পর্শে এলে এই রোগ দ্রুত সুস্থ মানুষের শরীরে সংক্রামিত হয়।