আফ্রিকার (Africa) কঙ্গোয় (Congo) মহামারীর চেহারা নিচ্ছে ইবোলা (Ebola)। মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়ে গিয়েছে সতেরোশো। সরকারি হিসেব বলছে, আক্রান্তের সংখ্যা এখন ৩৮০২। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ইতিহাসে এত দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা সংক্রমণ আগে দেখা যায়নি। পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organization) এবং কঙ্গো সরকার।
নতুন রেকর্ড
চলতি মহামারীর এপিসেন্টার পূর্ব কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশ (Ituri Province)। এখান থেকেই প্রায় ৯০ শতাংশ আক্রান্তের খোঁজ মিলেছে। তবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে আরও পাঁচটি প্রদেশে, এমনকি দেশের অন্যতম বড় শহর কিসাঙ্গানিতেও (Kisangani) হদিশ মিলেছে রোগীর। গত জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে এক সপ্তাহে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যুর রেকর্ড তৈরি হয়েছে। শুধু সেই সপ্তাহেই আক্রান্ত হয়েছেন ৫৬৭ জন, মৃত্যু হয়েছে ২৯৬ জনের।
সংক্রমণের উৎসই অধরা
চিকিৎসকদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, এখনও পর্যন্ত এই সংক্রমণের আসল উৎস অর্থাৎ প্রথম রোগীকে (patient zero) চিহ্নিত করা যায়নি। আফ্রিকা সিডিসির (Africa CDC) ডিরেক্টর জেনারেল জঁ কাসেয়া (Jean Kaseya) জানিয়েছেন, নতুন সংক্রমণের প্রায় ৮০ শতাংশ কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং (contact tracing) ছাড়াই সরাসরি সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে। তাঁর কথায়, এই মহামারী কবে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে, প্রায় সতেরো হাজার মানুষের গতিবিধির উপরে নজর রাখা হচ্ছে সংক্রমণের শৃঙ্খল বুঝতে।
যুদ্ধ, তহবিল সঙ্কট আর অবিশ্বাস
পূর্ব কঙ্গোয় দীর্ঘদিন ধরেই চলছে সশস্ত্র সংঘর্ষ। অস্থিরতার জেরে বহু মানুষ ঘরছাড়া। ফলে সংক্রমিতদের খুঁজে বার করাই কঠিন হয়ে পড়ছে। তার উপরে রয়েছে তহবিলের অভাব। আমেরিকার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা তহবিল (USAID funding) কমে যাওয়ায় স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় বড়সড় ধাক্কা লেগেছে। চিকিৎসাকেন্দ্রে হামলার ঘটনাও ঘটেছে একাধিকবার। বেতন না পেয়ে ধর্মঘটে গিয়েছেন বহু স্বাস্থ্যকর্মী। স্থানীয় মানুষের একাংশের মধ্যে ইবোলা নিয়ে অবিশ্বাসও কাজ চালাতে বাধা তৈরি করছে বলে জানাচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
টিকা নেই, চিকিৎসাও
এই মহামারীর জন্য দায়ী বান্দিবুগিয়ো প্রজাতির ভাইরাস (Bundibugyo virus)। ২০১৪ সালের পশ্চিম আফ্রিকার ভয়াবহ ইবোলার জন্য দায়ী ছিল জাইরে প্রজাতির ভাইরাস, যার একটি প্রতিষেধক টিকা আছে। কিন্তু বান্দিবুগিয়ো প্রজাতির জন্য এখনও পর্যন্ত কোনও অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা তৈরি হয়নি। তবে ইতুরিতে দুটি সম্ভাব্য চিকিৎসা পদ্ধতির উপরে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল (clinical trial) শুরু হয়েছে সম্প্রতি।
২০১৪ সালের সেই ভয়াবহতা
২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার ইবোলা মহামারীতে প্রাণ গিয়েছিল এগারো হাজারেরও বেশি মানুষের। সেই মহামারীতে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছুঁতে সময় লেগেছিল প্রায় আট মাস। বর্তমান সংক্রমণে সেই সংখ্যা ছোঁয়া হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। এই কারণেই বিশেষজ্ঞরা একে ইতিহাসের দ্রুততম বিস্তারলাভকারী ইবোলা সংক্রমণ বলছেন।
আমরা কতটা ঝুঁকিতে
ভারতে এখনও পর্যন্ত ইবোলার কোনও সংক্রমণের খবর মেলেনি। তবে পরিস্থিতি নজরে রেখে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক (Ministry of Health and Family Welfare) আগেই কঙ্গো, উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। বিমানবন্দরগুলিতে যাত্রীদের স্ক্রিনিং এবং স্বাস্থ্য ঘোষণাপত্র জমা দেওয়াও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জ্বর, মাথাব্যথা, গা-হাত-পায়ে ব্যথা, বমি, পাতলা পায়খানার মতো উপসর্গ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে পরামর্শে। রক্তক্ষরণ দেখা দেয় রোগের শেষ পর্যায়ে।
সতর্কতা: এই ধরনের সংক্রামক রোগ নিয়ে উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক। ব্যক্তিগত ভাবে কোনও উপসর্গ বা উদ্বেগ থাকলে অবশ্যই নিকটবর্তী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।