করোনা ভাইরাসের (Covid-19) সংক্রমণ শুধু ফুসফুসেই থাবা বসায় না। শরীরের ভিতরে বছরের পর বছর ধরে চুপচাপ ঘুমিয়ে থাকা একাধিক ভাইরাসকেও জাগিয়ে তুলতে পারে এই সংক্রমণ। সম্প্রতি নেচার (Nature) জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য। বিজ্ঞানীদের দাবি, লং কোভিডের (long Covid) পিছনেও এই সুপ্ত ভাইরাসগুলির পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠার বড় ভূমিকা থাকতে পারে।
কী বলছে গবেষণা
আমেরিকার বস্টন চিলড্রেন্স হাসপাতাল (Boston Children’s Hospital) এবং দেশের ১৫টি বায়োমেডিক্যাল গবেষণা কেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগে হয়েছে এই সমীক্ষা। ২০২০ সালের মে থেকে ২০২১ সালের মার্চের মধ্যে আমেরিকার ২০টি হাসপাতালে ভর্তি থাকা ১,১৫৪ জন করোনা রোগীর উপরে চালানো হয়েছিল এই গবেষণা। রোগীদের প্রায় অর্ধেকের শরীরেই অন্তত একটি সুপ্ত ভাইরাস নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল বলে দেখা গিয়েছে। এপস্টিন-বার ভাইরাস (Epstein-Barr virus), সাইটোমেগালোভাইরাস (cytomegalovirus), হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস (herpes simplex virus) এবং অ্যানেলোভাইরাস (anellovirus), মূলত এই চার ধরনের ভাইরাসের পুনরায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠার প্রমাণ মিলেছে রোগীদের শরীরে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাতেও ঝুঁকি
গবেষণার সবচেয়ে চমকে দেওয়া দিক হলো, যাঁদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারে স্বাভাবিক এবং যাঁরা রীতিমতো সুস্থ, তাঁদের শরীরেও এই ভাইরাসগুলি জেগে উঠেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার স্টেলেনবশ বিশ্ববিদ্যালয়ের (Stellenbosch University) ফিজিওলজিস্ট রেসিয়া প্রিটোরিয়াসের মতে, এতদিন ধারণা ছিল, শুধু দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের শরীরেই এমনটা হতে পারে। কিন্তু এই গবেষণা সেই পুরনো ধারণাকেই উল্টে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
গবেষণার সহ-লেখক তথা আমেরিকার টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোইমিউনোলজিস্ট এস্থার মেলামেডের ব্যাখ্যা, এপস্টিন-বার ভাইরাস এবং অ্যানেলোভাইরাস হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার একদম গোড়াতেই সক্রিয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে সাইটোমেগালোভাইরাস এবং হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস দেখা যায় প্রায় তিন সপ্তাহ পরে, মূলত শ্বাসযন্ত্রে। ভবিষ্যতে যদি প্রমাণিত হয় যে, এই পুনরায় সক্রিয় হওয়া ভাইরাসগুলিই রোগীর অবস্থা আরও গুরুতর করে তোলে, তাহলে করোনা তথা লং কোভিড চিকিৎসার নতুন দিশা মিলতে পারে বলেও আশাপ্রকাশ করেছেন তিনি।
ভাইরাসের ভাষা
গবেষকদের নজর সবচেয়ে বেশি কেড়েছে অ্যানেলোভাইরাস। এই ভাইরাস সাধারণত জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষের শরীরে সুপ্ত অবস্থায় থাকে, কিন্তু বড়সড় কোনও ক্ষতি করে না। তবে এই গবেষণায় দেখা গিয়েছে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরে অ্যানেলোভাইরাস সক্রিয় হয়ে উঠলে তা দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি এবং শারীরিক দুর্বলতার মতো লং কোভিডের উপসর্গের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকতে পারে। যদিও গবেষকেরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই ভাইরাস পুনরায় সক্রিয় হওয়াই যে লং কোভিডের কারণ, তার প্রমাণ এখনও মেলেনি।
বস্টন চিলড্রেন্স হাসপাতালের প্রিসিশন ভ্যাকসিন্স প্রোগ্রামের (Precision Vaccines Program) ডিরেক্টর ওফের লেভির কথায়, অনেকেই এখন আর করোনাকে বড় সমস্যা বলে মনে করেন না। কিন্তু বাস্তব হলো, ২০২৫-২৬ সালের শীতেই আমেরিকায় করোনায় প্রাণ গিয়েছে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের। আর লং কোভিডে ভুগছেন প্রায় এক কোটিরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকান। তাই এই রোগীদের সুস্থ করে তোলার রাস্তা খুঁজে বার করা এখনও জরুরি বলেই মনে করেন তিনি।
গবেষণার সীমাবদ্ধতা
গবেষকেরা অবশ্য এটাও জানিয়েছেন, যাঁদের উপরে এই সমীক্ষা চালানো হয়েছিল, তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন টিকাবিহীন এবং অতিমারির একেবারে গোড়ার দিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী। তাই বর্তমান করোনা প্রজাতি এবং ব্যাপক টিকাকরণের পরবর্তী সমসময়ে এই ফল ঠিক কতটা প্রযোজ্য, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবু বিজ্ঞানীদের আশা, শরীরের ভিতরের এই লুকনো ভাইরাল দুনিয়া নিয়ে নতুন করে ভাবার রাস্তা খুলে দিয়েছে এই গবেষণা। ভবিষ্যতে গুরুতর সংক্রমণ এবং লং কোভিড, দুই ক্ষেত্রেই নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি তৈরির পথ দেখাতে পারে এই তথ্য।